তীব্র জনবল সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো আর দীর্ঘ এক যুগ ধরে ব্যবস্থাপকশূন্য অবস্থায় চলছে রাজবাড়ীর একমাত্র সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার। এতে ১৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৪ জন। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গত তিন অর্থবছরে গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ভালো মানের বাচ্চা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে প্রতিদিনই প্রান্তিক খামারি, গৃহবধূ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভিড় বাড়ছে এই সরকারি খামারে।

তবে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শূন্য পদে দ্রুত জনবল নিয়োগ, জরাজীর্ণ ভবন ও শেড সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পাশাপাশি জেলার প্রান্তিক খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে মানসম্মত মুরগির বাচ্চা সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

‘রাজবাড়ীর একমাত্র সরকারি মুরগির খামার। এখানে ১৪ জনের পদের বিপরীতে আছি মাত্র ৪ জন। এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

জানা গেছে, জেলাজুড়ে ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ এবং বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৮১-৮২ সালে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের নতুনবাজার (মুরগি ফার্ম) এলাকায় ২ দশমিক ৮৮ একর জমিতে গড়ে ওঠে খামারটি। শুরুতে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার নামে হ্যাচারি কার্যক্রমসহ যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে সরকারি আদেশে ‘হাঁস’ শব্দটি বাদ দিয়ে এটি সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার নামকরণ করা হয়। ১৯৯৭ সালে বন্ধ হয়ে যায় খামার‌টির হ্যাচারি কার্যক্রম (বাচ্চা ফোটানো)। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে বাচ্চা এনে লালন-পালনের পর তা বিক্রি করা হয়। এখানে মোট ১২টি স্থাপনার মধ্যে জরাজীর্ণ হয়ে বর্তমানে ৫টি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সচল রয়েছে মাত্র ৭টি। জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে ব্যবস্থাপকের বাসভবন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দুটি আবাসিক ভবন, বিক্রয়কেন্দ্র এবং মুরগি পালনের ৪টি শেডের মধ্যে একটি শেড।

৪ জনের লড়াইয়ে টিকে আছে রাজবাড়ীর সরকারি মুরগি খামার
খামারে পালন করা হচ্ছে মুরগি/ ছবি: জাগো নিউজ

খামার সূত্রে জানা গেছে, খামারটিতে ব্যবস্থাপকসহ মোট ১৪টি পদ রয়েছে। তবে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। ২০১৪ সাল থেকে প্রায় ১২ বছর ধরে খামার ব্যবস্থাপকের পদটি খালি থাকায় বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. মেহেদী হাসান। অফিস সহকারীসহ পোলট্রি টেকনিশিয়ান ও নিরাপত্তা প্রহরীর ৫টি পদের বিপরীতে রয়েছে ৩ জন।

অন্যদিকে ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, পোলট্রি অ্যাটেনডেন্ট, হ্যাচারি অ্যাটেনডেন্ট, অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সম্পূর্ণ খালি রয়েছে। এমন চরম সংকটের মধ্যেও খামারের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকের কর্মদক্ষতায় প্রতি বছরই বাড়ছে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা। বর্তমানে বছরে খামারে ২০ হাজার মুরগি লালন-পালনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা রয়েছে।

‘রাজবাড়ীর অনেক পরিবার নিজ গৃহস্থালিতে ডিম ও মাংসের চাহিদা মেটাতে ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছে। খামারের সেবার মান নিশ্চিত ও শতভাগ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমি দ্রুত এই জনবল সংকট সমাধানের দাবি জানাচ্ছি।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭০ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০০ (শতভাগ) ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খামার‌টিতে ৯২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অ‌র্জিত হয়েছে। বর্তমানে খামার থেকে ভ্যাকসিনের ৪টি ডোজ সম্পন্ন করা ১ মাস বয়সি মুরগির বাচ্চা ৮০ টাকা এবং ৪২ দিন বয়সি বাচ্চা ১০০ টাকা দরে খামারিদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

৪ জনের লড়াইয়ে টিকে আছে রাজবাড়ীর সরকারি মুরগি খামার
খামারে জরাজীর্ণ ভবন/ ছবি: জাগো নিউজ

ক্রেতা ও উদ্যোক্তা শা‌হিন মোল্লা ও মোহাম্মদ আলী বলেন, এখানকার মুর‌গিগুলোর মান ভালো। মাঝে মধ্যে ২০‌ থেকে ৪০টি করে মুর‌গি নিই। এর আগেরও অনেকবার নিয়েছি। বাড়িতে লালন-পালন করি। বড় হলে নিজেরা কিছু খাই, কিছু মুর‌গি বিক্রিও ক‌রি। এখানে দাম যে খুব একটা বে‌শি তা না। অনেকাংশে বা‌জারের থেকেও এখানে দাম কম থাকে।

গৃহবধূ নাছ‌রিন বেগম ও নুরজাহান বেগম বলেন, এখান থেকে নিয়‌মিত মুর‌গি নিয়ে বাড়িতে লালন-পালন ক‌রি। এই মুরগির তেমন রোগ বালাই হয় না। তাছাড়া মুর‌গিগুলো ভালো। বড় হলে কিছু নিজেরা খাই এবং কিছু বিক্রি ক‌রি।

খামারের মাঈদুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকট থাকলেও আমাদের খামারের প‌রিবেশ ভালো। মুর‌গির বাচ্চাগুলো সুস্থ ও সবল। অ‌তি‌রিক্ত শ্রম দিয়ে প‌রিবেশ ভালো রাখার পাশাপা‌শি শতভাগ উৎপাদনের চেষ্টা কর‌ছি।

আরও পড়ুন

কালের সাক্ষী শতবর্ষী জলকল ভবন, আধুনিক যশোরে নিরাপদ পানির সংকট

রাজবাড়ী সরকারী মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মেহেদী হাসান বলেন, এটি রাজবাড়ীর একমাত্র সরকারি মুরগির খামার। এখানে ১৪ জনের পদের বিপরীতে আছি মাত্র ৪ জন। এই তীব্র জনবল সংকটের কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

‘এখানকার মুর‌গিগুলোর মান ভালো। মাঝে মধ্যে ২০‌ থেকে ৪০টি করে মুর‌গি নিই। এর আগেরও অনেকবার নিয়েছি। বাড়িতে লালন-পালন করি। বড় হলে নিজেরা কিছু খাই, কিছু মুর‌গি বিক্রিও ক‌রি। এখানে দাম যে খুব একটা বে‌শি তা না। অনেকাংশে বা‌জারের থেকেও এখানে দাম কম থাকে।’

তিনি বলেন, জনবল পূর্ণ থাকলে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হতো। বর্তমানে খামারে মুরগি পালনের ৪টি শেডের মধ্যে ৩টি সচল থাকলেও অন্য একটি শেডসহ আবাসিক ভবনগুলো ব্যবহারের একদম অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সরকার এগুলো সংস্কার করলে আমরা উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবো।

৪ জনের লড়াইয়ে টিকে আছে রাজবাড়ীর সরকারি মুরগি খামার
নষ্ট হয়ে গেছে খামারের শেড/ ছবি: জাগো নিউজ

মো. মেহেদী হাসান বলেন, গত দুই অর্থবছর আমাদের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার করে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শতভাগ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ২৯ দিন বয়সি মুরগি ৮০ টাকা এবং ৪২ দিনের বেশি বয়সি মুরগি ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। মূলত প্রান্তিক খামারি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সাধারণ পরিবারগুলোই এই মুরগির বাচ্চা নিয়ে লালন-পালন করছে।

আরও পড়ুন

ধ্বংসের পথে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের স্মৃতিধন্য বাড়ি

তিনি আরও বলেন, রাজবাড়ীর অনেক পরিবার নিজ গৃহস্থালিতে ডিম ও মাংসের চাহিদা মেটাতে ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছে। খামারের সেবার মান নিশ্চিত ও শতভাগ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমি দ্রুত এই জনবল সংকট সমাধানের দাবি জানাচ্ছি।

রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস জানান, খামারের এই তীব্র জনবল সংকটের বিষয়টি প্রতি মাসের পাঠানো প্রতিবেদনের সঙ্গে অধিদপ্তরে বিষয়টি জানানো হয়। পাশাপাশি বছরের শুরু ও মাঝামা‌ঝি সময়ে খামারের জরাজীর্ণ ভবন, পরিত্যক্ত শেড এবং অন্যান্য স্থাপনা মেরামতের জন্য নিয়মিত বাজেট চাওয়া হয়।

আরও পড়ুন

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

তিনি আরও জানান, গত বছরে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র একটি শেড সংস্কারের বাজেট পাওয়া গিয়েছিল, যা দিয়ে শেডটি সংস্কার করে পুনরায় চালু করা হয়। এরপর নতুন করে আর কোনো বরাদ্দ আসেনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলেই খামারের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়।

এনএইচআর/জেআইএম