- বিপিও খাতে কর্মসংস্থান হবে ৩ লাখ মানুষের
- ডিজিটাল মার্কেটিং উদ্যোক্তা তৈরি করছে
- রয়েছে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব
দেশের বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা (আইটিএস) খাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও নীতিগত সহায়তা, দক্ষ জনবল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে এ শিল্পের বাজার পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) সভাপতি তানভীর ইব্রাহীম।
তবে এ খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতা দক্ষ জনবলের অভাব। আর প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয় ঘটলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশও এ খাতে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।
জাগো নিউজ: দেশের বিপিও ও আইটিএস খাতের বর্তমান অবস্থা কেমন?
তানভীর ইব্রাহীম: আমি বলবো, খাতটি এখনো মূলত উদ্যোক্তানির্ভর। উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্যোগ, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে ভালো করছেন। তবে সম্ভাবনা অনেক বড়। দেশীয় বাজার যেমন বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারও বড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন
মায়ের ফোন দিয়েই ডিজিটাল দুনিয়া চেনা, এখন সফল ফ্রিল্যান্সার শামীম
আমাদের বিভিন্ন শিল্প- বিশেষ করে আর্থিক খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ই-কমার্সসহ নানান প্রতিষ্ঠান যদি তাদের আউটসোর্সযোগ্য সেবাগুলো বিপিও ও আইটিএস প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে, তাহলে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত হবে। এছাড়া সরকার নিজেই দেশের সবচেয়ে বড় আইটিএস ও বিপিও সেবাগ্রহীতা হতে পারে।
নাগরিক সেবাগুলো আউটসোর্সিংবান্ধব করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ জনবল। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে, যাতে শিল্পখাতের প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা কমে।
জাগো নিউজ: খাতটির প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী?
তানভীর ইব্রাহীম: সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে নীতিগত সহায়তার অভাব ও মানসিকতা। সরকার যদি নীতিগতভাবে বলে দেয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব মূল কাজ করবে, কিন্তু যেসব সেবা আউটসোর্স করা সম্ভব, সেগুলো আউটসোর্স করতে হবে- তাহলে শিল্পটি দ্রুত এগোবে।
আউটসোর্সিং মানে শুধু একটি শিল্পকে বড় করা নয়, বরং দক্ষতা বৃদ্ধি, সেবার মানোন্নয়ন ও ব্যয় কমানো। যেমন আমরা বাড়ি নির্মাণের জন্য স্থপতি ও প্রকৌশলীর সহায়তা নিই, কারণ তারা ওই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
আরও পড়ুন
কর্মক্ষেত্র ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের
একইভাবে যে প্রতিষ্ঠান যে সেবায় দক্ষ, তাদের মাধ্যমে কাজ করালে দক্ষতা বাড়বে। আমাদের এখন বুঝতে হবে, বিশ্ব এখন একটি সমতল বাজার। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল একত্র করতে পারলে বাংলাদেশও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভালো অবস্থানে যেতে পারবে।
জাগো নিউজ: দেশের ডিজিটাল মার্কেটিং খাতের বর্তমান অবস্থা কী?
তানভীর ইব্রাহীম: ডিজিটাল মার্কেটিং এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে বিজ্ঞাপন মানেই ছিল সংবাদপত্র বা প্রচলিত মাধ্যম। এখন সবকিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর। ওয়েবসাইট, এসইও, গুগল মার্কেটিং, পেইড অ্যাড, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট- এসবের পাশাপাশি এখন এআইভিত্তিক সার্চের কারণে এআই অপটিমাইজেশন (এইও) এবং জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের (জিইও) গুরুত্বও বেড়েছে।
ভবিষ্যতে এআই প্ল্যাটফর্মে দৃশ্যমান থাকতে এসব প্রযুক্তি অপরিহার্য হবে। ডিজিটাল মার্কেটিং এখন শুধু একটি পেশা নয়, এটি উদ্যোক্তা হওয়ার বড় সুযোগও। আমাদের অনেক ফ্রিল্যান্সার ডিজিটাল মার্কেটিং দিয়ে শুরু করে পরে কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, এমনকি বাক্কোর সদস্যও হয়েছেন।
জাগো নিউজ: ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বাজার কত বড়?
তানভীর ইব্রাহীম: বৈশ্বিক বিপিও ও আইটিএস বাজার প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারের। সেখানে ভারত প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করেছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কাও অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক ছোট অবস্থানে রয়েছে। তবে আমি এটাকে পিছিয়ে থাকা হিসেবে দেখি না, বরং এটাকে বড় হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছি।
আরও পড়ুন
আউটসোর্সিং সেবাগ্রহণ নীতিমালা জারি
বর্তমানে বাংলাদেশের বিপিও ও আইটিএস কোম্পানিগুলোর বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া ফ্রিল্যান্সাররা বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। সব মিলিয়ে বাজারের আকার প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
জাগো নিউজ: ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন?
তানভীর ইব্রাহীম: এটি উচ্চমূল্যের বাজার। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ মূলত তুলনামূলক কমমূল্যের কাজ করছে। কিন্তু ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং প্রসেস আউটসোর্সিং (এফঅ্যান্ডএ বিপিও) অনেক বেশি মূল্য সংযোজন করে।
এখন ক্লাউডভিত্তিক সফটওয়্যার যেমন জিরো (Xero), ট্যালি ( Tally) ও কুইকবুকস (QuickBooks) ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ সেবা দেওয়া সম্ভব। আমাদের অনেক উদ্যোক্তা বিদেশে উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। এখান থেকেই আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত।
জাগো নিউজ: দেশের কল সেন্টার খাতের বর্তমান অবস্থা কী?
তানভীর ইব্রাহীম: কল সেন্টার খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এ খাতের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব। সরকার যদি নাগরিক সেবার জন্য নির্দিষ্ট সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) নির্ধারণ করে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে এসব সেবা আউটসোর্স করবে।
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়া / পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা সহজ করতে আউটসোর্সিংয়ের সিদ্ধান্ত
বর্তমানে টেলিকম খাত তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি আউটসোর্সিং করছে। কিন্তু অন্য খাতে এখনো বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
জাগো নিউজ: আগামী পাঁচ বছরে এই শিল্পকে কোথায় দেখতে চান?
তানভীর ইব্রাহীম: আমি চাই আগামী পাঁচ বছরে দেশের আইটিএস ও বিপিও শিল্প অন্তত পাঁচগুণ বড় হোক। দুই বছর আগেও আমাদের হাতে এআই ছিল না। এখন এআই আমাদের উৎপাদনশীলতা, গতি ও ব্যয় দক্ষতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন
স্বাবলম্বী হতে আউটসোর্সিংয়ে ঝোঁক বাড়ছে তরুণদের
সরকারের নীতিগত সহায়তা, বাজেট বাস্তবায়ন, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও শিল্পখাতের উদ্যোগ- সব মিলিয়ে আমি বিশ্বাস করি, আগামী পাঁচ বছরে দেশের বিপিও ও আইটিএস বাজার পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
জাগো নিউজ: এ খাতে কর্মসংস্থানের দিক থেকে কী প্রত্যাশা করছেন?
তানভীর ইব্রাহীম: বর্তমানে এ খাতে প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী পাঁচ বছরে এই শিল্পে কর্মসংস্থান অন্তত তিনগুণ বাড়বে। প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
জাগো নিউজ: বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নানা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কীভাবে দেখছেন।
তানভীর ইব্রাহীম: নতুন সরকার প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছে, সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক। বাজেটে এবার আইসিটি খাত বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার বলেছে, বর্তমানে আইসিটি খাত জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখছে, সেটি ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
স্টার্টআপ ফান্ড, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রণোদনা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ








