• বাঁধ নির্মাণের দেড় মাসেই ধস
  • আতঙ্কে ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দারা
  • বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ

ভাঙন রোধে পদ্মার তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ। বাঁধ নির্মাণের পর নদীপাড়ের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন, এবার হয়তো আর হারাতে হবে না বসতভিটা। রক্ষা পাবে শেষ সম্বল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ম্লান দেড় মাসেই। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে নির্মিত নদী তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়েছে। বাঁধের সিসি ব্লক একের পর এক সরে গিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাজুড়ে।

লৌহজং উপজেলার গাউদিয়া ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মাপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠায় রাত কাটাচ্ছে। অনেকেই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাঙন কবলিত স্থানে প্রায় দেড় মাসে আগে বাঁধের কাজ শেষ করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড।

আরও পড়ুন

কুড়িগ্রামে বাড়ছে পানি, ভাঙছে নদীর পাড়

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ। সবমিলিয়ে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার এ প্রকল্পের কাজে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে কাজের মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নে নির্মিত নদী তীররক্ষা বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

৫২৭ কোটির বাঁধ টিকল মাত্র দেড় মাস!

নদীতীরের একজন বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম। তিনি জাগো নিউজকে জানান, রোববার (১২ জুলাই) বিকেলে গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে নদী তীররক্ষা বাঁধে হঠাৎ ধস দেখা দেয়। প্রথমে কয়েকটি সিসি ব্লক সরে গেলেও পরে দ্রুত বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কোনো ধরনের বিকট শব্দ ছাড়াই বাঁধের ব্লকগুলো পদ্মার স্রোতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। আতঙ্কে নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো ভয়ে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়।

আরও পড়ুন

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

‘৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারবো। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাবো কোথায়?’

আরেক বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, ‌‘বিকেলে হঠাৎ দেখি বাঁধের ব্লক ভেঙে নদীতে পড়ে যাচ্ছে। রাতে আতঙ্কে ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি না কোথায় থাকবো।’

৫২৭ কোটির বাঁধ টিকল মাত্র দেড় মাস!

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ খান বলেন, ‌‘৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে সব হারিয়েছি। বাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল এবার শান্তিতে ঘুমাতে পারবো। কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে আমরা যাবো কোথায়?’

আরও পড়ুন

পাহাড়ি ঢলে বিলীন হওয়ার পথে সাতছড়ি ত্রিপুরা পল্লী

পদ্মার ভাঙনে আরেক ভুক্তভোগী রিতা রানি দে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাঁধ দেখে মনে হয়েছিল আর ভয় থাকবে না। এখন আবার মনে হচ্ছে সব হারানোর সময় এসেছে।’

মনির চন্দ্র দে নামের আরেকজন বলেন, ‘আগে অনেক জায়গা-জমি নদীতে গেছে। এখানে এসে ভেবেছিলাম অন্তত থাকার জায়গাটা থাকবে। এখন সেই জায়গাটাও ঝুঁকিতে পড়েছে।’

৫২৭ কোটির বাঁধ টিকল মাত্র দেড় মাস!

আরও পড়ুন

গাইবান্ধা / নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করছে, চরাঞ্চলে ভাঙন অব্যাহত

স্থায়ী বাঁধে এত দ্রুত ধস নামায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা ত্রুটি ছিল কি-না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে সামনে নদীর পানি ও স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

৫২৭ কোটির বাঁধ টিকল মাত্র দেড় মাস!

‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পদ্মা নদীর বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ। সবমিলিয়ে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার এ প্রকল্পের কাজে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে’

আরও পড়ুন

‘সব নদীতে চলে গেছে, শুধু প্রাণটা নিয়ে বের হতে পেরেছি’

ভাঙনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা ভাঙনের স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

৫২৭ কোটির বাঁধ টিকল মাত্র দেড় মাস!

মুন্সিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, ‘এখন ভয়ের কোনো কারণ নেই। খবর পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে রয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, নদীর তীরে মাটি সরে যাওয়ায় স্থায়ীভাবে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ কারণে জিও ব্যাগ ফেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে বাঁধ নির্মাণের কাজে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইউএনও।

শুভ ঘোষ/এসআর/জেআইএম