নিমতলীর মতো অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, আবাসিক এলাকায় বেশি ভাড়ার লোভে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিলে দায় শুধু সরকারের নয়, নাগরিকেরও।

আজ রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি: অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামবে কবে?’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এই সেমিনারের আয়োজন করে।

মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘নিমতলীর ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটার পর আমরা কিছুদিন আলোচনা করি, স্মরণ করি; তারপর ভুলে যাই। এটা আমাদের সমাজের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে আইন আছে। কিন্তু আইন থাকার পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাগরিকের সচেতনতা। আমরা প্রায়ই বলি সরকার ব্যবস্থা নেয় না। কিন্তু অনেক সময় আমরা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করি।’

এখনো পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলছে উল্লেখ করে আবদুস সালাম বলেন, অনেকেই বেশি লাভের আশায় সরকার নির্ধারিত স্থানে যেতে চান না। অথচ এটা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা। ঘনবসতি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের উদাহরণ টেনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বলেন, ঢাকা শহরের এক জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। অনেকে নিজের বাড়িতে মশার প্রজননস্থল তৈরি করে রেখে পরে সিটি করপোরেশনকে দোষ দেন। একইভাবে রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রেও মানুষকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

আবদুস সালাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিও এখন বড় বাস্তবতা। দুর্যোগ ঘটার পর নয়, আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার, সিটি করপোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব থাকলেও সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের। এ জন্য বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদন একভাবে নিয়ে পরে অন্যভাবে ভবন নির্মাণের প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে আবদুস সালাম বলেন, ‘কাউকে দোষ দিচ্ছি না, তবে এটাও সত্য যে তাঁদের সুযোগ ছিল। তাঁরা আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল।’

ঢাকার সংকটের কথা তুলে ধরে আবদুস সালাম বলেন, পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, জলাবদ্ধতা বাড়ছে এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ চলছে। এ জন্য শুধু সিটি করপোরেশনকে দায়ী করলে হবে ন। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।

যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব: ডিএসসিসি প্রশাসক

পুরান ঢাকায় আবার পঞ্চায়েতভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, শুধু পুলিশ কিংবা আইন দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করা যায় না। এলাকার মানুষকেই এলাকার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

পুরান ঢাকার রাস্তা বড় করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে প্রশাসক বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। রিকশা, হকার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ধানমন্ডি লেক, গুলশান ও বনানীর মতো এলাকাও এখন অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এলাকাভিত্তিক ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, একসময় প্রতিটি এলাকায় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠন ছিল। তরুণেরা এলাকার ভালো-মন্দ দেখতেন। এখন সেই সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গেছে।

নিমতলীর মতো ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন আবদুস সালাম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, যুবসমাজ, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ সচেতন হলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হবে।

১০০ টাকার বেশি বিল নিলে, নিয়মিত ময়লা না সরালে লাইসেন্স বাতিল: ডিএসসিসি প্রশাসক

বাপার যুগ্ম সম্পাদক আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার সেমিনারে ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি: আবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামাবে কে?’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধে তিনি ভবিষ্যতে নিমতলীর মতো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানো, রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কাঠামো, ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন এবং বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়নসহ নীতিগত ১১টি সুপারিশ করেন।

বাপার সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক মেজর শাকিল, বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম, বাপার নির্বাহী সদস্য ইকবাল হাবিব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা সেমিনারে আলোচনা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক জাভেদ জাহান।

শর্তভঙ্গকারী ইজারাদারদের জামানত বাজেয়াপ্ত, কালোতালিকার সিদ্ধান্ত