একসময় রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত ও অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবাসিক ভবনগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ফলে এলাকাটি এখন ভয়াবহ যানজট, পার্কিং সংকট, শব্দদূষণ ও পরিবেশগত চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ৩১ বছর আগে প্রণীত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবহার নীতিমালা সংশোধন, পরিমার্জন ও হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ লক্ষ্যে গত ৮ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন নীতিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান নীতিমালাই কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে পুরোনো নীতিমালা লঙ্ঘন করে পরিচালিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাণিজ্যমন্ত্রী / ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সরকারের

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি পরিকল্পিত নগরীর অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সুস্পষ্ট বিভাজন। কিন্তু ধানমন্ডি, গুলশানসহ রাজধানীর বিভিন্ন পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিস্তারের ফলে সেই পরিকল্পনা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। আবাসিক ভবনে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক ব্যবহার শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং শব্দদূষণ, পার্কিং সংকট, পরিবেশের অবনতি এবং বাসিন্দাদের জীবনমানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০১৬ সালে প্রকাশিত এক মাঠপর্যায়ের জরিপে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল তদারকি এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতার কারণে রাজধানীর ধানমন্ডি দ্রুত আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরিত হচ্ছে। এক হাজার ৫৯২টি ভবনের মধ্যে ৮২৩টি আবাসিক হলেও ৫৩২টি আবাসিক-বাণিজ্যিক এবং ২৩৭টি পুরোপুরি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ শতাংশ ভবন কোনো না কোনোভাবে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, ব্যাংক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

আরও পড়ুন

খিলগাঁওয়ে আবাসিক ভবনে রেস্তোরাঁ, সাততলা ভবন সিলগালা

সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব বলেন, ১৯৯৫ সালে প্রণীত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবহারের নীতিমালার আওতায় বাণিজ্যিক ব্যবহারে অনুমতি দেওয়া প্লটের ওপর নির্মিত ভবনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে বলেন। এতে নীতিমালা পরিপন্থি কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার বা অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

এছাড়া তিনি ঢাকা শহরের কোনো এলাকার প্লটকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউককে অবশ্যই মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়ার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক নীতিমালার ধারাগুলো যুগোপযোগী নগরায়ণ প্রবণতা ও বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং পরিমার্জনে অতিরিক্ত সচিবকে (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনেরও নির্দেশনা দেন। ‌

সভায় জানানো হয়, ১৯৯৫ সালে প্রণীত নীতিমালার আওতায় মিরপুর রোড, সাতমসজিদ রোড, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি-২ (পুরাতন) ও ধানমন্ডি-২৭ (পুরাতন) সড়কসংলগ্ন প্লটগুলোতে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ৩১ বছরে নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ফলে সেই নীতিমালার অনেক ধারা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই ধানমন্ডির আবাসিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

সরকারি অফিসকে আবাসিক ভবন বানিয়ে থাকছেন ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী

সভায় অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) বলেন, অধিকাংশ বাণিজ্যিক ভবনে পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকায় প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার, অননুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকা শহরের কোনো এলাকার প্লটের মূল মাস্টারপ্ল্যান পরিবর্তন করে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার আগে রাজউককে অবশ্যই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন নিতে হবে।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অতিরিক্ত সচিবকে (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক নীতিমালার খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে কমিটি।

আরও পড়ুন

গৃহায়ন ও গণপূর্তে এক বছরে সরকারের যত অর্জন

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি সভায় জানানো হয়, ধানমন্ডি এলাকায় অনুমোদিত বাণিজ্যিক প্লট ছাড়াও কিছু আবাসিক ভবন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ভবন ব্যবহারকারী, গ্রাহক ও দর্শনার্থীদের যানবাহন সড়কের ওপর পার্কিং করতে দেখা যায়, যা এলাকার স্বাভাবিক যান চলাচল এবং পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাবার হোটেল ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সামনে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকে। 

রমনার উপ-পুলিশ কমিশনার আরও জানান, পরিকল্পিত ধানমন্ডিতে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কার পার্কিং, যানবাহন প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মতামত গ্রহণের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যমান বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও পার্কিং ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও অনুরোধ জানান তিনি।

এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকীকরণ সংক্রান্ত নীতিমালায় পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা নিশ্চিতকরণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে যানজট নিরসন এবং এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট অতি ঝুঁকিপূর্ণ, নূর ম্যানশন ঝুঁকিপূর্ণ

সভায় রাজউকের প্রতিনিধি জানান, ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পার্কিং, পরিবেশগত প্রভাব, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন নীতিমালা বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ (বিবিআরএ), রাজউকের মাস্টার প্ল্যান এবং সংশ্লিষ্ট আইন-বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ) মো. মনিরুজ্জামান মিঞা জাগো নিউজকে বলেন, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় নিয়ম ভেঙে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছেন না। এভাবে আর কতদিন চলবে! সরকার এগুলোকে একটা শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা করছে।

ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় নিয়ম ভেঙে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছেন না। সরকার এগুলোকে একটা শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা করছে।— গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুজ্জামান মিঞা

তিনি বলেন, ‘নীতিমালা সংশোধনের গঠিত কমিটি কাজ করছে। এছাড়া মিটিংকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরএমএম/এমএএইচ/ এমএফএ