৩৫ বছর ধরে আচার বিক্রি করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করলেও মূলধনের অভাবে ব্যবসা বড় করতে পারেননি মাদারীপুরের ফয়সাল মোল্লা (৫৫)। মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকপাড়ে ভ্যানগাড়িতে করে আচার বিক্রি করে মাসে আয় করেন ৯০ হাজার টাকা। এ আয় দিয়ে সংসারের সমস্ত খরচ যোগাড় করতে পারলেও ব্যবসাটা বড় করতে পারেননি ফয়সাল।
খোজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর শহরে ঘরে আচার বানিয়ে তা বিক্রি করতে তেমন একটা দেখা যায়না। আগে বিভিন্ন স্কুলের সামনে মাথায় করে বা ভ্রাম্যমাণ ভাবে আচার বিক্রি করতে দেখা গেলেও কালের বিবর্তণে তা আজ হারিয়ে গেছে। তাই আচারপ্রেমীরা প্রক্রিয়াধীন প্যাকেটজাত আচার বিভিন্ন দোকান থেকে কিনে। তবে ঘরে বানিয়ে তা বিক্রি করার এ ঐতিহ্যটি এখনও ধরে রেখেছেন আমিরাবাদ এলাকার সিরাজ মোল্লার ছেলে ফয়সাল মোল্লা| দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ভ্যানগাড়িতে করে নানা রকমের আচার বিক্রি করেন তিনি। আচার বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়ে ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করিয়েছেন। তার বড় ছেলে জুবায়ের হোসেন আকাশ মোল্লা মাদারীপুর সরকারী কলেজে মার্স্টাসে পড়েন। মেঝ ছেলে আদনান মোল্লা লেখাপড়া করেন না। ছোট মেয়ে সামিয়া আক্তার লামিয়া একই কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়েন।
খোজ নিয়ে আরও জানা যায়, বর্তমানে ফয়সার মোল্লার স্যালক রাজু হোসেন তার ব্যবসা পরিচালনায় সহযোগিতা করে আসছেন। তাছাড়া ঘরে বসে আচার বানাতে তার স্ত্রী নুরজাহান বেগমও সহযোগিতা করে থাকেন।
আমের ফলি, আমের তেলের আচার, আমের মোরব্বা, টক-ঝাল আম আচার, বরই, টক-ঝাল জলপাই, চালতার মোরব্বা, চালতার ঝুরি, তেঁতুল, আমড়ার টক-ঝাল, রসুন, কাঁচা মরিচ, নাগা মরিচসহ প্রতিদিন প্রায় ১৫ রকমের আচার বানিয়ে তা বিক্রি করেন। সর্বনিম্ন ২০ টাকার আচার বিক্রি করেন তিনি। অনেক সময় কেজিতেও আচার বিক্রি হয়। আচারের ধরণ অনুযায়ী কেজি প্রতি ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টাকার আচার বিক্রি করেন তিনি।

তবে ফয়সাল মোল্লার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিলো নিজের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হবে। সেখানে নানা রকমের আচার বিক্রি করবেন। কিন্তু টাকার অভাবে তা করা সম্ভব হয়নি। প্রতিদিন যে টাকা আয় করেন, তা পুরোটাই চলে যায় সংসারের পিছনে। টাকা জমিয়ে ব্যবসা বড় করা আর সম্ভব হয়নি তার।
আচারের ক্রেতা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘চাকরি করি, তাই ঘরে বসে আচার বানানোর সময় হয় না। যখনই পরিবারের কেউ আচার খেতে চায়, এখান থেকে নিয়ে যায়। আমি ছোটবেলা থেকেই এ আচারের সাথে পরিচিত।
আচার ব্যবসায়ি ফয়সাল মোল্লা বলেন, ‘বহু বছর ধরে আচারের ব্যবসা করছি। আমার স্ত্রীরও আচার বানানোর অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। শহরজুড়ে আমার আচার সবাই পছন্দ করেন। অনেকে দুর দুরান্ত থেকেও এ লেকপাড়ে আচার কিনতে ছুটে আসেন। তবে অনেক স্বপ্ন ছিলো এ ব্যবসাটাকে বড় করার। কিন্তু মুলধনের অভাবে তা করতে পারিনি।’
মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘বহু বছর হয়ে গেলো ফয়সাল এ শকুনি লেকপাড়ে আচার বিক্রি করেন। বিকেল হলেই লেকপাড়ে ঘুরতে আসা মানুষজন তার কাছ থেকে আচার কিনে থাকেন। আমিও পরিবার নিয়ে অসংখ্যবার এখান থেকে আচার কিনে খেয়েছি।
মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের পরিচালক এবিএম বজলুর রহমান খান বলেন, ‘ছোটখাট এ ব্যবসাগুলোর ব্যাপারে সরকারী ও বেসরকারী ভাবে এগিয়ে আসলে তারা আরও উন্নতি করতে পারতো। বিশেষ করে তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা, সহজে এবং কোনো শর্তছাড়া ব্যাংক থেকে অল্পসুদে ঋণ দিলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িরা তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারতো। যা অর্থনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/কেজে/এএসএম








