অভিলাষ মাহমুদ
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিসরে কিছু মানুষের অবদান সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তেমনই একজন মনীষী, যিনি শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য-সমালোচক এবং সমাজচিন্তক হিসেবে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বৌদ্ধিক জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই তার মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির জীবনাবসান নয়, বরং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীনচিন্তা, বিশ্লেষণী মনন এবং সাহিত্যকে সমাজবাস্তবতার আলোকে পাঠ করার প্রবণতা গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষ ছিল জ্ঞান বিনিময়ের মুক্ত পরিসর, যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান একসূত্রে মিলিত হতো।
তাঁর গবেষণা ও প্রবন্ধের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ। বাংলা সাহিত্যকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন নন্দনতত্ত্বের বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে সাহিত্যকে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক বাংলা প্রাবন্ধিকদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের রচনা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ আজও গবেষকদের জন্য মূল্যবান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিকতার প্রশ্ন নিয়েও গভীর চিন্তাশীল লেখালেখি করেছেন। তাঁর লেখায় আবেগের চেয়ে যুক্তি, পক্ষপাতের চেয়ে প্রমাণ এবং স্লোগানের চেয়ে বিশ্লেষণ অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলা একাডেমিকে কেবল একটি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণা, জ্ঞানচর্চা এবং ভাষা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে আরও কার্যকর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের আলোচনা গুরুত্ব পায়। অধ্যাপক ফজলুল হকের চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানবিক মূল্যবোধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের কেবল কর্মসংস্থানের পথ নয়; এটি একজন মানুষকে নৈতিক, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই তাঁর রচনায় শিক্ষা, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সংস্কৃতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর দ্রুত প্রতিক্রিয়ার যুগে তাঁর লেখাগুলো পাঠে আমরা বুঝতে পারি যে-গভীর গবেষণা, ধৈর্যশীল পাঠ এবং প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই। মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও তিনি সমান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের রচনাসম্ভার বাংলাসাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন, সমাজচিন্তা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য তাঁর বই, প্রবন্ধ এবং বক্তৃতা বাংলাদেশের চিন্তার ইতিহাস অনুধাবনের এক নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হয়ে থাকবে। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যকে সমাজ-ইতিহাসের আলোকে পাঠ করার যে পদ্ধতি তিনি অনুসরণ করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গন, শিক্ষা-জগৎ এবং গবেষণা সমাজ একজন প্রজ্ঞাবান চিন্তাবিদকে হারাল। তবে একজন প্রকৃত শিক্ষকের স¦-শরীরে প্রস্থান হলেও তিনি তাঁর ছাত্রদের মধ্যে, তাঁর গ্রন্থসম্ভারে, তাঁর যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তায় এবং তাঁর নির্মিত বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের মধ্যেই বেঁচে থাকেন।
জ্ঞানচর্চা কেবল পেশা হিসাবে না নিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসাবে। ভাষা, সাহিত্য এবং জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু তাঁর চিন্তা, গবেষণা এবং প্রজ্ঞার উত্তরাধিকার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে দীর্ঘদিন পথ দেখাবে। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক: কবি ও গাল্পিক
কেএসকে








