রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আজ শুক্র বা আগামীকাল শনিবার পদত্যাগ করতে পারেন মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক অসুস্থতাকে তিনি পদত্যাগের কারণ হিসেবে দেখাতে পারেন। পদত্যাগের পর চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে যাবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যাওয়া স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দুপুরেই দেশে ফিরছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকারকে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়।

সূত্র জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগ করার জন্য সম্প্রতি বিএনপির হাইকমান্ড থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নেই। রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে, স্বাস্থ্যগত কারণে বা অন্য যেকোনো কারণে তাঁর সেই সুযোগ রয়েছে। তবে তাঁরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না। সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় যা দেখছেন, সেটাই দেখছেন। যদি এমন কিছু ঘটে, তখন আমরাও দেখব।’

স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন কি না, এ প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা তাঁকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে।’

সূত্র জানায়, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা টেলিফোন করে পদত্যাগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলেছেন। পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিনকে কোনো ধরনের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে না, এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।

বঙ্গভবনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন সাহাবুদ্দিন। এ ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ হিসেবে দেখাতে পারেন তিনি। পদত্যাগ করার পর চিকিৎসার জন্য তাঁর বিদেশে যাওয়ার কথা রয়েছে।

পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি এখনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি। পদত্যাগ করলে জানানো হবে।

রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, পদত্যাগের পর বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরবেন সাহাবুদ্দিন। এরপর লেখালেখি করে সময় কাটাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছেন না সাহাবুদ্দিন। কারণ, বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে বলে ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছেন তিনি।

বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১-এর ধারা ২(ক)-এর ক্ষমতাবলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গত ২৩ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে জানায়, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অথবা পদত্যাগ করলে পদত্যাগের তারিখ থেকে ছয় মাস পর্যন্ত তাঁরা রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) হিসেবে থাকবেন। সেই হিসেবে পদত্যাগ করার পর ছয় মাস এসএসএফ নিরাপত্তা পাবেন সাহাবুদ্দিন।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে স্পিকারের কাছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন চিকিৎসার জন্য ১৯ জুলাই থাইল্যান্ড গেছেন। ২৬ জুলাই তাঁর দেশে ফেরার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দুপুরে তিনি দেশে ফিরবেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সময় স্পিকারকে দেশে বা সশরীরে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারকে দায়িত্ব নিতে হয়। বিষয়টি মাথায় রেখেই স্পিকারকে আজ দেশে ফেরানো হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশে সবশেষ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার প্রয়াত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। তিনি ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, সে নিয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপির সূত্র জানায়, সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে বিএনপি সংসদীয় দলের সভায় রাষ্ট্রপতি পদে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের নামও রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছে।

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ পাঁচ বছর। আজ ২৪ জুলাই তাঁর দায়িত্ব পালনের ৩ বছর ৩ মাস পার হবে। ২০২৮ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে, তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন। তবে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে ওই বছরের ২২ অক্টোবর বিকেল থেকে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন একদল ছাত্র-জনতা। ইনকিলাব মঞ্চ, রক্তিম জুলাই ’২৪, ৩৬ জুলাই পরিষদ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন বঙ্গভবনের সামনে সড়ক অবরোধ করে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এরপর বঙ্গভবনের সামনে সেনা মোতায়েন করে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার ছিল। অবশ্য সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কায় বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনের মধ্যে আবদ্ধ থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী দল বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাঁকে অনুষ্ঠানে দেখা যায়। বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ পূর্ণ করাবে কি না, রাজনৈতিক অঙ্গনে সেই আলাপ ওঠে। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করে ওয়াকআউট করে। তবে রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে আগের অবস্থানেই ছিল বিএনপি।

রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, (২০২৬ সালের) ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে অপমান করেছে বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, না হলে পদত্যাগ করবেন।

বিএনপির সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির পদে সাহাবুদ্দিনকে পূর্ণ মেয়াদে না হলেও আরও কিছুদিন রাখার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। গত ৯ থেকে ১৮ মে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে ছিলেন রাষ্ট্রপতি। ওই সময় ফোনে তিনি ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে টেলিফোন আলাপে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বলেছেন বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির টেলিফোন আলাপের বিষয়টি জানার পর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সাহাবুদ্দিনকে সরানোর বিষয়ে আলোচনা তোলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। পরে রাষ্ট্রপতিকে সরে যাওয়ার বার্তা জানিয়ে দেওয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে ২৬ জুন দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রেওয়াজ অনুযায়ী, বিদেশ সফর থেকে দেশে ফিরে সরকারপ্রধান বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তবে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় সফর শেষে দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেননি তারেক রহমান।