আলমগীর কবীরের চলচ্চিত্র–যাত্রার প্রায় শেষের দিকের নির্মাণ ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মহানায়ক’। পরিচালক অকালপ্রয়াত হয়েছেন, সেই ক্ষতি ভোলার নয়। আবার আধ্যাত্মিক দর্শনে নির্বাণ যেমন একটি চূড়ান্ত স্তর, একটু অন্যভাবে শিল্পজগতের আচার্য আলমগীর কবীরের এই নির্মাণকেও নির্মাণ না বলে চলচ্চিত্রশিল্প কারিগরি দর্শনের নির্বাণ লাভ বলা যেতে পারে।
কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, পরিচালনা বিশ্ববোদ্ধা সাধক পরিচালকের। কাহিনির মধ্যে আহামরি কিছু আছে বলে মনে হয়নি। তবে অভিনবত্ব আছে কাহিনি দেখানোর বা উপস্থাপনের দর্শনে। এই উপস্থাপনের কারণেই চলচ্চিত্রটির কাহিনি একটি দেশীয় চোরাকারবারি বা আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি মাফিয়া চক্রের বৃত্তান্ত হতে গিয়েও হয়ে ওঠেনি। হয়ে উঠেছে দেশের অতি সাধারণ ছেলেরা সৎভাবে বাঁচার চেষ্টা করেও বেকারত্বের যন্ত্রণায় কীভাবে অন্ধকার জগতে তলিয়ে যায়, চোরাকারবারি চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, হন্যে হয়ে বাঁচার, মুক্তির পথ খুঁজে বেড়ায় এবং বেরিয়ে আসার পথ খুঁজলে বেরিয়ে আসাও যায়। পরিচালক পরিস্থিতির শিকার হওয়া দেশের তরুণকে সেই সৎ পথে ফিরিয়ে আনেন। তার পরম আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় ভালোবাসার এক মানুষ।
জীবনে ভালোবাসার মূল্য যে কতটা, মানুষের মন যে বারবার প্রেমে পড়ে, প্রেমের পথে মুক্তি খুঁজে বেড়ায়, প্রেম জীবনের এক নির্বাণ পথের সন্ধান, পরম আশ্রয়, বসন্তের পাতার মতো প্রেম জীবনের এক নির্মাণ, ফুল ফুটুক না ফুটুক বসন্ত চিরকালের—পরিচালক সেই দর্শনও তুলে আনেন।
আলমগীর কবীর একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, মেধাবী, মননশীল বিশ্বমানের পরিচালক। প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ থেকেই তাঁর শিল্পযাত্রার উচ্চকিত মাত্রার সৃজনশীল কারিগরি দক্ষতার পরিচয় আমরা পেয়েছি। দেশ–বিদেশ ঘুরে পড়াশেনা করে, দেশের এবং বিদেশের সামাজিক রাজনৈতিক নানা গঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি বিশ্বচেতনার সঙ্গে স্বদেশচেতনাকে মিলিয়ে দিতে পারেন—সৃষ্টিশীলতার মধ্যেও সেই বিদ্যা, দর্শন এসে পড়ে। আমাদের দস্যু রত্নাকরও তো বোধ উত্তীর্ণ হয়ে বাল্মীকি হয়ে উঠেছিলেন। মনোভূমিতে মহাকাব্য রচনা করে মহাকবি হয়েছেন। এই কাহিনির ‘মহানায়ক’ নামটিও সেই অর্থে ব্যঞ্জনাবাহী, যথার্থ।
এ ক্ষেত্রে আরও একটি দর্শন লুকায়িত থাকে—যেকোনো মহাপুরুষ আপন কীর্তিতে জ্ঞানে, দর্শনে, সৃষ্টিশীলতায় মহান হয়ে উঠলেও ব্যক্তিজীবনে থাকতে হয় অতি সাধারণ। তাহলেই তিনি মাটি ও মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে মিশে থেকে নিশ্বাসে–বিশ্বাসে রসদ খুঁজে নিতে পারেন। আজীবনের লড়াকু পরিচালক চিরকালই সেভাবেই অতি সাধারণ ছিলেন। আর মহাপুরুষের আলোকস্পর্শে যেভাবে মহাপুরুষের জন্ম হয়, সেভাবেই অতি সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের মাটির সত্যিকার অর্থের অন্য এক মহানায়ক বুলবুল আহমেদ।
ভিন্নধারার গল্পে ‘রকস্টার’ দর্শকদের কতটা মুগ্ধ করতে পেরেছে‘মহানায়ক’ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং প্রযোজকও তিনি। একজন সাধারণ সংসারী, ব্যাংক কর্মীকে ভেতরের সুপ্ত সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়ে জনমানসের, জনমানুষের অভিনেতা করে তুলেছিলেন আলমগীর কবীর। বুলবুল আহমেদ সার্বিক অর্থেই আলমগীর কবীরের আবিষ্কার। নিজের চরিত্রের প্রয়োজনে চরিত্র খুঁজতে গিয়ে ভিন্নধারার চলচ্চিত্রের যথা উপযুক্ত খ্যাতিমান অভিনেতাকে তুলে আনতে পেরেছিলেন। বুলবুল আহমেদ একই সঙ্গে দর্শনধারী এবং মেধা ও প্রতিভাবিচারী একজন বড় মাপের সাধক অভিনেতা। নিরন্তর অভিনয় সাধনা তাঁর শিরায় রক্তস্রোতের মতো প্রতিটি চলচ্চিত্রে অভিনয় দেখে অনুভব করা যায়।
‘মহানায়ক’ চলচ্চিত্রে মহানায়কের পাশে সেই অর্থে কোনো প্রথিতযশা তারকা মহানায়িকা না থাকলেও অভিনয়ের দ্যুতিতে সুমিতা চৌধুরী, সুবর্ণা পোখরেল যথার্থ সহযোদ্ধা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। এই চলচ্চিত্রে রীনা খান, কাজরী, জুলিয়া একাধিক সুন্দরী, সু–অভিনেত্রী রয়েছেন। রয়েছেন দিলদার, শওকত আকবর, আশীষ কুমার লোহ, অমল বোস, সুমিতা দেবী, আহমেদ শরীফের মতো কিংবদন্তি সব অভিনেতা। এ ধরনের চলচ্চিত্রে তথাকথিত তারকা নয়, অভিনয় গুণসম্পন্ন উচ্চমাপের শিল্পীদেরই সমাবেশ ঘটে থাকে। গুণীদের নিয়েই চাঁদের আসর বসে।
পরিচালক আর প্রযোজক মিলে একই সঙ্গে থাইল্যান্ড, কাঠমান্ডু, বাংলাদেশে শুটিংয়ের ব্যবস্থা করেন। মূল কাহিনিও সেভাবেই সাজানো। প্রতিটি দেশের স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক স্থানের মাহাত্ম্য ক্যামেরায় ভাস্বর হয়ে ওঠে।
থাইল্যান্ড কন্যা লিন্ডার সঙ্গে রানার অন্তরঙ্গ দৃশ্য প্রাণ পায়। লিন্ডার চোখ তুলে চাহনির মধ্যেই অসম্ভব সুন্দর কবিতা লুকিয়ে থাকে। যেভাবে বুলবুলের কথা বলার ধরন, চাহনির ভাষা এবং মিষ্টি হাসির মধ্যে শব্দের সঙ্গে শব্দ যুক্ত হয়ে ভাবের ছন্দের বোধের কবিতার জন্ম হয়। সমুদ্র ভ্রমণে গান বুকে ঢেউয়ের তোলপাড় তোলে।
নেপালি পাহাড়ি কন্যা শিলা যেন নিজের মধ্যেই অনাবিল পাহাড়ি পট এবং প্রকৃতি ধরে রাখে। রানা যে কত বড় মাপের প্রেমিক সত্তা, প্রত্যেক আলাদা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব এবং প্রেমিক সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে যান, যেতে পারেন, কোথাও মনে হয় না ছদ্ম প্রেমিক সত্তার অভিনয় করছেন, অভিনয়ের পরতে পরতে ফুটে ওঠে এক নিষ্পাপ প্রেমের উদাসী হেম হয়ে ওঠা নিষ্পাপ কারিগর।
কক্সবাজারেও প্রেম জমে ওঠে। ১৯৮৪ সালে আজকের দিনের মতো এত দামি ক্যামেরা ছিল না, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা ছিল না—এর মধ্যে পরিচালক, প্রযোজক এবং সমগ্র চলচ্চিত্র নির্মাণের টিম মিলে যেটুকু তুলে আনতে পেরেছে তা স্বাভাবিক, সাবলীল, এককথায় অনবদ্য।
গোটা চলচ্চিত্রের মূল কাহিনি একজন প্রতারকের অথচ পরিচালক এমনভাবে কাহিনি তুলে আনেন, কোথাও মনে হয় একজন প্রতারকের প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত তুমুল হয়ে ওঠে। মূল প্রতিপাদ্য অবশ্যই আলোর ঠিকানা। টুকরো টুকরো দৃশ্য হৃদয়ে বাঁধানো ছবি হয়ে ওঠে।
গান এই ছবির মূল্যবান সম্পদ। শেখ সাদী খান সংগীত পরিচালনা করেছেন। মনিরুজ্জামান মনির, নজরুল ইসলাম বাবু, মাসুদ করিম, জাহিদুল হক গান লিখেছেন। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, হৈমন্তী শুক্লা, এন্ড্রু কিশোর, সুবীর নন্দীর কণ্ঠে সেই গান প্রাণ পেয়েছে।
সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘আমার এই দুটি চোখ পাথর তো নয় তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়...’ নেপালি কন্যার সঙ্গে প্রণয়ের দৃশ্যে সুন্দর চিত্রায়িত হয়েছে। যদিও ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে একটি কথাই শুধু জেনেছি আমি, পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই...’ গানটি কালজয়ী হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সুবীর নন্দীর কণ্ঠে বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে এ গানটি বারবার শুনে এসেছি। এই গানের দৃশ্যে কাজরীর সঙ্গে সুন্দর অভিনয় করেছেন বুলবুল।
‘তুমি চাও প্রিয়া নদী হয়ে...’ হৈমন্তী শুক্লা আর সুবীর নন্দীর দ্বৈত কণ্ঠে এ গানটিও নদীর তরঙ্গ বয়ে আনে। হৃদয় ভাসিয়ে দেয়। গানের সঙ্গে সুমিতা চৌধুরীর নৃত্যশৈলী থাইল্যান্ডের বুকে প্রেম নদীর বহমানতাকে বাংলার পাহাড়ি নদীর তরঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। নদীও যে নারীর মতো, সুমিতাকে দেখে সেই বোধের জন্ম হয়। এই চলচ্চিত্রে এক ঝাঁক সুন্দরী নদী আছে। নূপুরের ধ্বনির মতো তাঁদের সুর বুকে বাজে। আর নদীর পাশে বয়ে চলেন মহানায়ক বুলবুল আহমেদ।








