‘আমি ভাবি, যদি আবার, ছুঁতে পারতাম তোমাকে। সত্যি বা, স্বপ্নই হোক, এ দূরত্ব শেষ হয়ে যেত যে’, জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘জারা জারা’র বাংলা অনুবাদ এটি। পর্তুগাল অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এই গান কখনো শুনেছেন কিনা বলা মুশকিল। তবে অন্য ভাষায় একই ছন্দে এই গানটাই হয়তো গতকাল তার মনে মনে বাজছিল। একে একে ৬টি, নিজের শেষ বিশ্বকাপও খেলে ফেললেন রোনালদো। ফিরলেন খালি হাতেই, এ জন্মে আর বিশ্বকাপ জেতা হলো না তার। ফলে বিদায় বেলায় হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফির কথা মনে করে রোনালদোর মনে বাজতেই পারে, ‘আমি ভাবি, যদি ছুঁতে পারতাম তোমাকে।’
প্রতিপক্ষ স্পেন, এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম হট ফেভারিট। ফলে ফল কি হতে পারে সেটা অনেকটাই আন্দাজ করা যাচ্ছিল, হয়তো রোনালদো নিজেও জানতেন। তাই বুঝি ম্যাচের আগেই বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ জিতলে আমি বেশি ক্রিস্টিয়ানো হয়ে যাবো না, না জিতলে কমেও যাবো না।’ সে মুখেই যাই বলুন, ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সবকিছু জেতা রোনালদোর মনেও তো বিশ্বকাপ জেতার সুপ্ত বাসনা ছিলোই। কে না চায় বিশ্বকাপ জিততে।
২০২২ বিশ্বকাপেই মনে হয়েছিল, এটাই শেষ! মরক্কোর বিপক্ষে হারের পর টানেলে ঢুকতেই রোনালদোকে দেখা যায় কান্না করতে। তবে ৪ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও রোনালদো খেললেন। তবে ঠিক ফুটবল কতটুকু খেললেন, আর মাঠের বাইরের আলোচনায় কতটুকু থাকলেন এ নিয়ে আলোচনার জায়গা থাকতে পারে। একদম শুরু থেকেই রোনালদোর সঙ্গে দলের বাকি সবার মানসিক দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে উঠলো পরিস্কার ভাবে।
প্রথম ম্যাচে রোনালদো যতটা বাজে খেললেন, ম্যাচের আগে কাউকে সেটা বললে পাগল বলতো। ডি আর কঙ্গোর বিপক্ষে পুরো ম্যাচে অনেক সময়ই ছিলেন ‘দর্শক’ হয়ে। প্রথমার্ধে মাত্র ১৬ টাচ। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের বক্সে একবার—অন্য ভাষায় রোনালদো যেন বোতলবন্দী দর্শক! বিরতির পরও নিজের ছায়া থেকে বেরোতে পারেননি তিনি।
পরের ম্যাচেই অবশ্য দারুণ কামব্যাক করলেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের ৫-০ গোলের জয়ে রোনালদো করেন জোড়া গোল। তবে পরের দুই ম্যাচে আবার সেই পুরোনো রোগ। প্রতিটি মুহূর্ত বুঝিয়ে দিচ্ছিল বয়স আসলেই প্রভাব ফেলছে। আগের মতো রিফ্লেক্স নেই, নেই ক্ষিপ্রতা। এর সঙ্গে সতীর্থদের সঙ্গে মানসিক দুরত্ব পুরো পরিবেশকেই আরো ঘোলাটে করে ফেলেছিল।
একই সময়ে আর্জেন্টিনার দিকে তাকালে দেখা যায় ৪০ বছরের লিওনেল মেসির জন্য জীবন দিতেও রাজি সতীর্থরা। তার প্রভাব মাঠেও দেখা যায়, মানসিকভাবে উৎফুল্ল থাকা ৪০ বছরের মেসির সঙ্গে সর্বোচ্চ গোলে পাল্লা দিতে হচ্ছে হালের কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ডদের। তবে অন্য প্রশ্নও আছে, রোনালদো কি সেই পরিবেশ নিজে তৈরী করতে পারছেন না? নাকি তার ইগো সেই সতীর্থদের তার কাছে আসতে দিচ্ছে না। এ নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, ক্যারিয়ারে ৯৭৫ গোল করা সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের এমন বিদায় মানাটা কঠিন।
বয়স হয়েছে, রিফ্লেক্স কমেছে! বিদায় তো এক সময়ে হতোই, সেটা বিশ্বকাপ না জিতলেও। বিশ্বকাপ না জেতা হাজারো তারকা রয়েছে। লিওনেল মেসিও পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে পরম আরাধ্য ট্রফিটা জিতেছেন। রোনালদোর বিশ্বকাপ জেতা হলো না। তবে এর চেয়ে বড় বিষয় শেষ বেলায় তাকে রীতিমতো একঘরে হয়ে বিদায় নিতে হলো। প্রথম ম্যাচের পর রোনালদোকে পাস দেন না সতীর্থরা, এ নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। প্রথমে সতীর্থরা বলতে চাইলেন এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই পরে বললেন রোনালোদ সেরা! চিন্তা করুন তো, মেসিকে নিয়ে কোনো আর্জেন্টাইন এমন কিছু বলেছে! চিন্তাই করতে পারবেন না!।
রোনালদোর পারফরম্যান্স নিয়ে সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটন বলেছেন, ‘একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডকে নড়াচড়া করতে হয়, খেলায় অবদান রাখতে হয়, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে হয়। কিন্তু রোনালদোর মধ্যে কিছুই ছিল না। তিনি যেন মাঠে একজন বৃদ্ধ মানুষের মতো ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন। এ কারণেই পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে। এই পর্তুগাল দলে অসাধারণ অনেক ফুটবলার আছেন। তাঁদের অনেকেরই মনে হবে, এই বিশ্বকাপটা খেলতে এসে তাঁদের সময় নষ্ট হয়েছে।’
বাদ দেওয়া যাক এসব আলোচনা, রোনালদোই কিন্তু লিওনেল মেসির পর একমাত্র ফুটবলার যিনি কিনা টানা ষষ্ট বিশ্বকাপ খেললেন। শেষ বাঁশি বাজার পর অনেকক্ষণ মাঠেই স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন। চারপাশে তখন অসংখ্য ক্যামেরার লেন্স, সবকটিই খুজে নিলো তাকে। নিজেকে সামলে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন তিনি। চোখে জমে থাকা জল লুকাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ক্যামেরা সরেনি।
বিশ্বকাপকে বিদায় বলার সম্ভাবনা যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে, সেটার জন্য হয়তো মানসিকভাবে প্রস্তুতই ছিলেন। তবু সেই মুহূর্তের ভার শেষ পর্যন্ত আর বহন করতে পারলেন না। ক্যামেরা জুম করে কাছে নিতেই ধরা পড়ল তার মুখ—ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে নীরবে অশ্রু ঝরাচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মহাতারকা।
সতীর্থদের কাছ থেকেও খুব একটা সাড়া পেলেন না। কেউ কেউ এগিয়ে এসে আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে হাত মেলালেন, আলিঙ্গনও করলেন। কিন্তু সেই আলিঙ্গনে ছিল না কোনো আবেগ, ছিল না সান্ত্বনার উষ্ণতা। মুহূর্তগুলো এতটাই নিরাসক্ত ছিল যে, মনে হচ্ছিল এড়িয়ে গেলেই হয়তো আরও মানবিক দেখাত। পুরো বিশ্বকাপটাই রোনালদোর এমন কেটেছে, যেন বিচ্ছিন দ্বীপ!
যারা সত্যিকার অর্থে খেলাধুলাকে ভালোবাসেন, তাদের কাছে রোনালদোর সেই কান্নাভেজা মুখ নিঃসন্দেহে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এক দৃশ্য। মাঠ ছেড়ে টানেলের দিকে হাঁটার সময় টেলিভিশনের ক্যামেরা শেষবারের মতো তাকে অনুসরণ করল। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যের পরই তিনি হারিয়ে গেলেন পর্দার আড়ালে। হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও।
রেকর্ড তাড়া করে বেড়ানো রোনালদোর শেষ ম্যাচেও থাকলো রেকর্ড! যদিও সেতা খুব একটা সুখকর নয়, সবচেয়ে বেশি হার। বিশ্বকাপে আটটি করে হার রয়েছে আরও চার খেলোয়াড়ের—ম্যাথিউ লেকি, সন হিউং-মিন, আন্তোনিও কারবাহাল ও হং মিয়ুং-বোর।
ক্যারিয়ারে ৯৭৫ গোল করেছেন, সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। কয়েকদিন আগে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরকে এনে দিয়েছেন লিগ শিরোপা। ইংল্যান্ড, ইতালি, স্পেন তিন দেশের লীগ জিতেছেন। পর্তুগালের জয়ে জিতেছেন দুটি নেশন্স লিগের শিরোপা। তবু বিশ্বকাপটাই জেতা হলো না রোনালদোর। পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই মহাতারকা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটিই ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না। এ কারণেই হয়তো ম্যাচ শেষে নিজেকে স্বান্তনা দিতে চাইলেন, ‘আমি ২০১৬ ইউরো জিতেছি। আমার কাছে সেই শিরোপার মর্যাদা বিশ্বকাপ জয়ের সমান। সেই অর্জন চিরকাল আমার সঙ্গেই থাকবে।’
‘হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারাজীবনের বেদনা। আজো তবু হেসে যাও, বিদায়ের দিন তবু কেঁদো না। ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না’ কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতাটা কোনো না কোনো ভাবে আজ প্রত্যেক রোনালদো ভক্তের মনের কোনে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। রোনালদো অবশ্য পারেননি। না পেরেছেন বিদায় বেলা রাঙাতে, না পেরেছেন নিজেকে সামলাতে।
এসকেডি/এএসএম








