এমনকি কখনো হতে পারে? কখনো কি কফিনের কোনো ফাঁকফোকর বা জানালা থাকে? উপন্যাসের নাম ‘কফিনের জানালা’ [২০২৫]। মনস্ক পাঠক প্রথমে যেন ধাক্কা খাবেন নামটি দেখে; কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আপনাকে যদি জাদুবাস্তবতার জগতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, নিয়ে যাওয়া হয় সেই কল্পিত কাহিনিতে, আর সত্যি সত্যি আপনি যদি কফিনের জানালা দেখতে পান, তবে কেমন লাগবে আপনার? সেই মৃত মানুষটি বা শবদেহ কফিনের ভেতর থেকে সেই জানালা দিয়ে কী দেখেন বা দেখলেন? এমন একটি কাহিনিকে উপজীব্য করে আন্দালিব রাশদী রচনা করেছেন তার জাদুবাস্তবতার উপন্যাস ‘কফিনের জানালা’।
জাতীয় সাহিত্য একাডেমির কাকাতুয়া চত্বরের বকুলতলায় বেদির ওপরে রাখা হয়েছে দেশের বরেণ্য চিত্রপরিচালক ও প্রযোজকের কফিন। উপন্যাসের শুরু এখান থেকেই। সেই কফিনের ফাঁক দিয়ে, লেখক যাকে বলেছেন জানালা, চিত্রপরিচালক ও প্রযোজক দেখছেন তার তৃতীয় স্ত্রী পদ্ম’র একেবারে গা ঘেঁষে জাতির শুভাকাঙ্ক্ষী একজন বুদ্ধিজীবী তার শরীরের নেতিয়ে পড়া সংবেদনশীল কোনো একটি অংশ তার স্ত্রীর মাংসল শরীরের কোনো কোমল অংশে ঠেকিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ছেন। তার ফুসফুস পরিবহণ করে আসা কার্বন-ডাই-অক্সাইড মেশানো দূষিত নিশ্বাস পড়ছে তার স্ত্রীর ঘাড়ে। সেই বুদ্ধিজীবীকে তার মোটেই পছন্দ হলো না।
উত্তম পুরুষে লেখা এ উপন্যাসের উত্তম পুরুষটি যখন একজন সেলিব্রেটি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক, তখন তার জীবনের অনেক কাহিনি এ উপন্যাসে উঠে এসেছে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো। তার কফিনের পাশে তার সদ্য বিধবা স্ত্রী পদ্ম, যার থেকে তিনি চল্লিশ বছরের বড়, এক অপেরা শিল্পী ঝর্নার মেয়ে হলেও এখন এ দেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা নায়িকা, সেও সেলিব্রেটি। দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে চেতনাবাদী সেলিব্রেটি লাশ প্রদর্শন সমিতি কাকাতুয়া চত্বরে দাফনের আগে তার কফিন প্রদর্শন করছে, শেষবারের মতো তাকে দেখানোর জন্য হাজির করেছে নানা শ্রেণিপেশা ও মিডিয়ার মানুষ। ক্যামেরার সামনে তার গুণগান করে বক্তব্য দিচ্ছে, বারবার চোখ মুছছে। চিত্রপরিচালকের প্রথম স্ত্রী শেহেরজাদ বেগম। চিত্রপরিচালক-প্রযোজক বলছেন তার প্রথম স্ত্রীর প্রাণ কৈ মাছের প্রাণ, তিনি কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন, অর্থাৎ অমরত্ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী সৈয়দা মাফরুহা সুলতানা অতিশয় সজ্জন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারী ছিলেন। এ ঘরে তার তিন মেয়ে। মেয়েরা স্বামী নিয়ে বিদেশে থাকে। বাবা ফিল্মের লোক, নানা গসিপ বাতাসে ওড়ে। এসব থেকে দূরে রাখার জন্য মেয়েদের তিনি বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার এ স্ত্রী মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান ছোট মেয়েকে সাড়ে তিন বছরের রেখে। তার তৃতীয় স্ত্রী পদ্ম, এ উপন্যাসের মূল নারী চরিত্র। ছোট ছোট নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে গেছে। অনেক চরিত্রের সম্মেলন ঘটেছে উপন্যাসে, কিন্তু সব চরিত্রই তেমনভাবে বিকশিত হয়নি বা হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। যেমন, প্রথম স্ত্রী শেহেরজাদ বেগম, উনিশ বছরের উঠতি নায়িকা সুরাইয়া বানু ওরফে তুতুমনি, সৈয়দা মাফরুহা সুলতানার প্রথম স্বামী, যিনি বিয়ের রাতে পালিয়ে গেছেন সেই কাজি সাজ্জাদ হোসাইন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রূপমাধুরী অপেরা দলের গায়িকা ঝর্না, পরিচালক প্রযোজকের বন্ধু ডব্লিউএইচখান মানে ওয়াজেদুল হাসনাত খান, যাকে সবাই ডব্লিউ বলে ডাকে ইত্যাদি চরিত্রগুলো প্রয়োজনে এসেছে এবং একসময় উপন্যাস থেকে বেরিয়ে গেছে। তবে খুব অল্প কথায় কিন্তু যৌক্তিকভাবে লেখক তার তিন মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনা, ভ্যালেন্টিনা এবং ম্যাডোনার চরিত্র ছোট ছোট মোট তিনটি ফোনকল ও ফেসবুকের নোংরা বার্তার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা খুব স্বাভাবিক ও চিরন্তন মনে হয়েছে। এত অপমান বা অপদস্থ হওয়ার পরও পদ্ম তার তিন সৎ মেয়ের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছে-‘তাদের জায়গায় আমি থাকলে হয়তো আরও খারাপ কিছু বলতাম’।
বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক-প্রযোজক দেশে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ৩৫০০০ ফুট উঁচুতে এ বিমান ভ্রমণের যে বর্ণনা এবং স্বামীর প্রতি পদ্ম’র যে আকুলতা লেখক দেখিয়েছেন, তা তার লেখনীর মুনশিয়ানার প্রমাণ দেয়; কিন্তু সেখানে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত চিত্রপরিচালক ও প্রযোজক। তার লাশ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়, বারডেম হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়। অনেক নামিদামি লোকজন, মন্ত্রী-মিনিস্টার, আমলা, টিভির মালিক তাকে দেখতে আসেন। বিদেশে থাকা তুতুমনিও আসে, যদিও তার ক্ষুব্ধ মেয়েরা আসে না। সব ঘটনার বর্ণনা লেখক খুব সূক্ষ্ম ও কথোপকথনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন; যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে।
এ উপন্যাসের কাহিনি আমাদের অনেকের কাছেই খুব পরিচিত মনে হতে পারে। লেখক খুব রসাত্মক ও সহজিয়া ভঙ্গিতে তার কফিন প্রদর্শন ও দাফনের শেষ সময়ের পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন; যা আমাদের কাছে পরিচিত অথচ উপস্থাপনার কারণে নতুন মনে হবে। ব্লকবাস্টার মুভি তৈরির এমন একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজকের জীবন এমনই ঘটনাবহুল ও চমৎকৃত হতেই পারে। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ‘ডুব’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেই চলচ্চিত্রটি নিয়েও এমন কথা উঠেছিল। কিন্তু উপন্যাস প্রকৃতপক্ষে উপন্যাস এবং শেষ পর্যন্ত তা উপন্যাসই থাকে; তবে অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা এবং খণ্ডচিত্র অনেকের জীবনের সঙ্গে মিলে যেতেও পারে। লেখক সেদিক দিয়ে তেমন দায় থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
‘কফিনের জানালা’ আমাদের তেমনি একটি উপন্যাস, যা লেখক আন্দালিব রাশদী তার মুগ্ধতার ভাষায় পাঠককে উপহার দিয়েছেন। মনস্ক পাঠক উপন্যাসটি পড়ে আমাদের ক্ষয়িষ্ণু ও ভোগবাদী সমাজের একটি অংশের জীবনযাপনের অপ্রকাশিত এবং আড়ালে রক্ষিত চিত্রগুলো দেখতে পাবেন, যা লেখকের কৌশলী লেখার কারণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। জাদুবাস্তবতার ভেতর দিয়ে এমন একটি বাস্তবতার গল্প ‘কফিনের জানালা’ তুলে এনেছে, যা আমাদের অনেকের চোখও খুলে দেবে। নয়নজুলি প্রকাশিত এ উপন্যাসটির বহুল প্রচার কামনা করি।
‘কফিনের জানালা’। লেখক : আন্দালিব রাশদী। প্রকাশক : নয়নজুলি, ঢাকা। প্রকাশকাল : জানুয়ারি, ২০২৫। প্রচ্ছদ : কিউবিস্ট পেইন্টিং অবলম্বনে সাগর আহমেদ। পৃষ্ঠা : ৯৪। মূল্য : ৩০০ টাকা।








