চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রায় ১১ মাস অতিবাহিত হলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেই। তারা বলছে, ‘উপর মহলের ক্লিয়ারেন্স’ না থাকায় এই নির্বাচনে জিতেছিল শিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রাকসু নির্বাচনকে ক্যালেন্ডারভুক্ত করা। এ নিয়ে তাদের পক্ষ থেকেও কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।

গত বছরের জুলাই মাসে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে নির্বাচনের তারিখ সেপ্টেম্বরে নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষের দিকে হলেও নতুন করে রাকসু নির্বাচন আয়োজন করা নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান।

অধ্যাপক সেতাউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আপাতত নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে কোনো ক্লিয়ারেন্স প্রশাসনের কাছে নাই। ওপরের নির্দেশ না পেলে প্রশাসন হয়তো আগাতে পারবে না। এ বছর হচ্ছে নাকি সামনে হবে—এটাও বলা যাবে না।’ তবে রাকসু নির্বাচন আয়োজন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করছে না বলেও জানান তিনি।

সেতাউর রহমান আরও বলেন, ‘যখনই ওপর থেকে ক্লিয়ারেন্স আসবে, তখনই যেকোনো সময় মাঠে নামা যাবে। না হলে হবে না। তবে না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ধরে নিতে হবে। উপাচার্যের ওপরও ডিপেন্ড করছে না। এটা প্রাইম মিনিস্টার যদি বলি, তাহলে বিষয়টা সে রকম।’

রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘যারা নির্বাচন আয়োজন করবে, সেই প্রশাসনের অনীহা লক্ষ করছি; যা আশঙ্কা তৈরি করছে।’

এদিকে নির্ধারিত সময়েই রাকসু নির্বাচন আয়োজনে জোরালো দাবি জানানোর কথা বলছেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করব, নির্ধারিত সময়ে রাকসু হবে। আমার বিশ্বাস অন্যরাও এটাই চাইবে। যদি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হয়, তাহলে আমরা আমাদের জায়গা থেকে রাকসু আদায়ের জন্য কাজ করব।’ তবে তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো দপ্তরের মধ্যে রাকসুকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হচ্ছে।

হতাশ শিক্ষার্থীরা: দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর রাকসু নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার্থীদের। রাকসুর মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে হলেও শিক্ষার্থীরা এখনো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব করছেন। শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, দীর্ঘ সময় পর রাকসু নির্বাচন নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান কমিটির কার্যক্রমে তার অনেকটাই পূরণ হয়নি। বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি নিয়ে রাকসুর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করলেও বাস্তবে তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। এমনকি রাকসুর অবাস্তব কিছু ইশতেহারও শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘রাকসুর বর্তমান বডি অবশ্যই শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। ৩৫ বছর পর রাকসুর যে মাহাত্ম্য বা রাকসুর যে তাৎপর্য, সেটাকে আসলে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি। কিন্তু এসব ব্যর্থতার পরও আসলে রাকসু হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’

তবে রাকসু নির্বাচনকে ক্যালেন্ডারভুক্তের ইশতেহার বিষয়ে রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, ‘সর্বশেষ অধিবেশনেও আমরা রাকসু নির্বাচনকে অ্যাজেন্ডা হিসেবে রেখেছিলাম এবং উপাচার্যকে বিষয়টি জানিয়েছি। তিনি আমাদের বলেন, দেখা যাক, আলোচনা করা যাবে।’

এদিকে রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সব সময়ই চাই, ছাত্র সংসদ থাকুক এবং নির্বাচন হোক। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। শুধু সময় হলেই নির্বাচন করা সম্ভব নয়; সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অনুকূলে থাকতে হয়।’