আজ বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস। যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা, শিক্ষা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অপরিহার্য।

ছবি, ভিডিও, ব্যক্তিগত তথ্য, এমনকি ব্যাংকিং-সংক্রান্ত কিআজ ছু কার্যক্রমও অনেকেই এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন। কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে সাইবার ঝুঁকিও। প্রশ্ন হলো-আপনার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট কতটা নিরাপদ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার অপরাধীরা এখন আর শুধু প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি করে না; সাধারণ ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টও তাদের লক্ষ্য। একটি অসুরক্ষিত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা প্রতারণা, পরিচয় চুরি, অর্থ হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মতো অপরাধ ঘটাতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া নিরাপদ রাখা এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

ইনস্টাগ্রামে ডিলিট করা চ্যাট ফিরে পাবেন যেভাবে

কেন আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাকারদের লক্ষ্য?

অনেকেই মনে করেন, ‘আমার অ্যাকাউন্টে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই।’ কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আপনার ছবি, পরিচয়, বন্ধুদের তালিকা, ফোন নম্বর, ই-মেইল, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য-এসবই সাইবার অপরাধীদের কাছে মূল্যবান। অ্যাকাউন্ট দখল করার পর তারা আপনার পরিচয়ে অন্যদের কাছে অর্থ চাইতে পারে, ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব পাঠাতে পারে কিংবা ক্ষতিকর লিংক ছড়িয়ে আরও অনেককে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ডই প্রথম সুরক্ষা

অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার প্রথম শর্ত হলো শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। এখনও অনেকেই নিজের নাম, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর বা ‘১২৩৪৫৬’ ধরনের সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। এগুলো অনুমান করা খুবই সহজ। একটি ভালো পাসওয়ার্ডে বড় ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্নের সমন্বয় থাকা উচিত। একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি অ্যাকাউন্টের তথ্য ফাঁস হলে অন্য অ্যাকাউন্টও ঝুঁকিতে পড়ে।

দুই স্তরের নিরাপত্তা চালু করুন

বর্তমানে প্রায় সব জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দুই স্তরের নিরাপত্তা (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) সুবিধা রয়েছে। এটি চালু থাকলে পাসওয়ার্ড জানা থাকলেও নতুন কোনো ডিভাইস থেকে প্রবেশের সময় অতিরিক্ত একটি নিরাপত্তা কোড প্রয়োজন হয়। ফলে পাসওয়ার্ড চুরি হলেও সহজে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা যায় না। সম্ভব হলে এসএমএসের পরিবর্তে অথেনটিকেটর অ্যাপ ব্যবহার করা আরও নিরাপদ।

আরও পড়ুন

মেসেজিং হবে আরও স্মার্ট, হোয়াটসঅ্যাপে আসছে আইফোনের মতো ফিচার

অপরিচিত লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক হোন

‘আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’, ‘পুরস্কার জিতেছেন’, ‘ভিডিওটি দেখুন’ এ ধরনের বার্তা প্রায়ই প্রতারণার অংশ হয়ে থাকে। এসব লিংকে ক্লিক করলে আপনাকে এমন একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, যা দেখতে আসল প্ল্যাটফর্মের মতো হলেও আসলে ভুয়া। সেখানে ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ড লিখলেই তা সরাসরি প্রতারকদের হাতে চলে যায়। কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে ঠিকানাটি ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

গোপনীয়তা সেটিংস নিয়মিত পরীক্ষা করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আপনার ফোন নম্বর, ই-মেইল, জন্মদিন, বাসার ঠিকানা কিংবা পরিবারের তথ্য কে দেখতে পারবে, তা গোপনীয়তা সেটিংস থেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। বন্ধু তালিকাও সবার জন্য উন্মুক্ত না রাখাই ভালো। যত কম ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করবেন, ঝুঁকিও তত কম থাকবে।

সন্দেহজনক অ্যাপের অনুমতি বাতিল করুন

অনেক সময় বিভিন্ন কুইজ, গেম বা তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা অজান্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার দিয়ে দেই। এসব অ্যাপ অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই নিয়মিত অ্যাকাউন্টের সেটিংসে গিয়ে কোন কোন অ্যাপ অনুমতি পেয়েছে তা দেখে অপ্রয়োজনীয়গুলোর প্রবেশাধিকার বাতিল করুন।

অপরিচিত ডিভাইসে লগইন করবেন না

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পাবলিক কম্পিউটার বা অন্যের মোবাইল ফোনে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ না করার পরামর্শ দেন।প্রয়োজনে লগইন করতেই হলে কাজ শেষে অবশ্যই লগআউট করুন এবং ব্রাউজারে পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করবেন না।

আরও পড়ুন

ডট বিডি ও ডট বাংলা ডোমেইন নিবন্ধন সেবা দিচ্ছে আম্বার আইটি

নিয়মিত লগইন ইতিহাস পরীক্ষা করুন

বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কোন কোন ডিভাইস থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা হয়েছে, তা দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। অপরিচিত কোনো ডিভাইস বা অবস্থান দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে সেই সেশন থেকে বের করে দিন এবং পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন।

ভুয়া প্রোফাইল সম্পর্কে সচেতন থাকুন

সাইবার অপরাধীরা পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার আগে প্রোফাইলটি যাচাই করুন। সন্দেহ হলে ভিডিও কল বা অন্য কোনো মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করুন।

সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখুন

মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেম, ব্রাউজার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপ নিয়মিত হালনাগাদ করুন। নতুন সংস্করণে সাধারণত নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি সংশোধন করা হয়। পুরোনো সংস্করণ ব্যবহার করলে পরিচিত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাইবার হামলা চালানো সহজ হয়ে যায়।

সন্তানদের অনলাইন নিরাপত্তায় নজর দিন

শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা প্রায়ই অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলে। অভিভাবকদের উচিত তাদের গোপনীয়তা সেটিংস, বন্ধু তালিকা এবং অনলাইন আচরণ সম্পর্কে সচেতন করা। শুধু প্রযুক্তি নয়, সচেতনতাও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সাইবার অপরাধের কৌশলও তত বদলাচ্ছে। তাই নিরাপদ থাকার দায়িত্ব শুধু প্ল্যাটফর্মের নয়, ব্যবহারকারীরও।

আরও পড়ুন

এবার ইনস্টাগ্রাম রিলস-স্টোরি দেখা যাবে টিভি পর্দায়

বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবসে নতুন কোনো অ্যাপ ব্যবহারের আগে কিংবা নতুন ছবি পোস্ট করার আগে একবার নিজের নিরাপত্তা সেটিংস দেখে নিন। কয়েক মিনিটের এই সচেতনতাই আপনাকে বড় ধরনের সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

জেএস/