কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবার গণিত গবেষণায়ও নতুন ইতিহাস গড়ার ইঙ্গিত দিল। ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের নতুন বৃহৎ ভাষা মডেল GPT-5.6 Sol প্রায় ৫০ বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা বিখ্যাত ‘সাইকেল ডাবল কভার কনজেকচার’-এর (Cycle Double Cover Conjecture) একটি পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। গত শুক্রবার মডেলটির পূর্ণাঙ্গ উন্মুক্ত প্রকাশের সঙ্গে মিলিয়ে এই সাফল্যের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জানা গেছে, ১৯৭০-এর দশকে উত্থাপিত ওই কনজেকচার গ্রাফ তত্ত্বের (Graph Theory) একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। গ্রাফ বলতে একগুচ্ছ বিন্দু (ভার্টেক্স) এবং সেগুলোকে সংযুক্ত করা রেখা বোঝায়। বাস্তব জীবনে ইন্টারনেট, যোগাযোগ ব্যবস্থা কিংবা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে গ্রাফ তত্ত্বের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

কনজেকচারটির মূল ধারণা হলো—প্রায় সব ধরনের গ্রাফকে এমন কিছু বন্ধ লুপ বা ‘সাইকেল’-এর মাধ্যমে উপস্থাপন করা সম্ভব, যাতে প্রতিটি সংযোগরেখা ঠিক দুইবার করে অন্তর্ভুক্ত হয়। গত পাঁচ দশকে বিশ্বের বহু খ্যাতনামা গণিতবিদ বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এর প্রমাণ দিতে পারলেও সাধারণভাবে সমস্যাটির সমাধান করতে পারেননি।

ওপেনএআই-এর দাবি, তাদের এআই-উৎপাদিত প্রমাণ দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী যে কোনো গ্রাফকে সর্বোচ্চ আটটি উপযুক্ত সাইকেলের মাধ্যমে এই শর্ত পূরণ করা সম্ভব। বিশেষ ধরনের কিছু গ্রাফ, যেখানে বড় দুটি অংশ মাত্র একটি সংযোগরেখার মাধ্যমে যুক্ত থাকে, সেগুলো এই ফলাফলের বাইরে রাখা হয়েছে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ নোগা অ্যালন এই অর্জনকে গণিত গবেষণায় এআইয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বহু বছর ধরে আলোচিত একটি জটিল কনজেকচারের এত সংক্ষিপ্ত প্রমাণ সত্যিই বিস্ময়কর।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক অ্যান্ড্রু সাদারল্যান্ডের মতে, কোনো সমস্যাকে দীর্ঘদিন ‘কঠিন’ বলে মনে করা হলে গবেষকেরা সেটি নিয়ে কম কাজ করেন। ফলে সমস্যার কঠিন হওয়ার ধারণাই একসময় বাস্তবতার রূপ নেয়। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে আরও অনেক তথাকথিত কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান বড় ভাষা মডেলের মাধ্যমে সামনে আসতে পারে।

ওপেনএআই সফলতার পেছনের নির্দেশনাও (প্রম্পট) প্রকাশ করেছে। সেখানে মডেলটিকে একাধিক ধাপে চিন্তা করতে, সমান্তরালভাবে ৬৪টি এআই এজেন্টের মাধ্যমে কাজ ভাগ করে নিতে এবং দ্রুত হাল ছেড়ে না দিতে বলা হয়েছিল। এমনকি একটি নির্দেশনায় বলা হয়, ‘সমাধান না পেয়ে ফিরে আসা বা হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবার আগে অন্তত আট ঘণ্টা চেষ্টা করো।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি গণিত সমস্যার সমাধান নয়; বরং ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও গাণিতিক আবিষ্কারের অন্যতম শক্তিশালী সহায়ক হয়ে উঠতে পারে—এমন সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।