একসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ির টুংটাং শব্দ, বেত চেঁছে নকশা তৈরির ব্যস্ততা আর ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকত রাজশাহী নগরীর হোসনিগঞ্জ বেতপট্টি। ঐতিহ্যবাহী এই জনপদ ছিল রাজশাহীর বেতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের পালাবদলে সেই কর্মচাঞ্চল্য আজ অনেকটাই ফিকে। কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতির চাপ, বাজারে প্লাস্টিক ও সিনথেটিক পণ্যের আধিপত্য, দক্ষ কারিগরের সংকট এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একসময় সমৃদ্ধ এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে।

জানা গেছে, একসময় বেতপট্টিতে ১৫ থেকে ২০টি দোকানে শতাধিক কারিগরের কর্মব্যস্ততা দেখা যেত, সেখানে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র তিনটি দোকান। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে রাজশাহীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।

সরেজমিনে হোসনিগঞ্জ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি পুরোনো দোকানে এখনও বেতের চেয়ার, ঝুড়ি ও ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। তবে আগের মতো আর কর্মব্যস্ততা নেই। দোকানগুলোতে নেই নতুন কর্মী, নেই ক্রেতাদের ভিড়। অনেক কারিগর পেশা বদল করে অন্য কাজে চলে গেছেন।

আরও পড়ুন

সিলেটের শতবর্ষী বেতশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, কয়েক দশক আগে সিলেট অঞ্চলের কিছু দক্ষ কারিগর রাজশাহীতে এসে বেতশিল্পের ভিত্তি গড়ে তোলেন। তাদের হাত ধরে হোসনিগঞ্জে গড়ে ওঠে একটি সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল। পরে স্থানীয় অনেক পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়। ধীরে ধীরে বেতশিল্প রাজশাহীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

‘আগে দোকানে চার-পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। এখন মাত্র একজন আছেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকা থেকে বেত আনতে হয়। সময়মতো সরবরাহ পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।’

একসময় বিয়ের অনুষ্ঠানে বেতের তৈরি ট্রে, ঝুড়ি, চেয়ার কিংবা উপহার সামগ্রী দেওয়া ছিল রীতির অংশ। নবদম্পতির ঘর সাজাতেও ব্যবহৃত হতো বেতের আসবাবপত্র। মধ্যবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের ড্রইংরুমে বেতের তৈরি আসবাবপত্র ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চাহিদা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

অস্তিত্ব সংকটে হোসনিগঞ্জের বেতশিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররাবেতের তৈরি জিনিষপত্র/ ছবি: জাগো নিউজ

দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন কর্মচারী মো. লিটন শেখ। তিনি বলেন, আগে বেতপট্টিতে ১৫-২০টা দোকান ছিল, এখন আছে মাত্র তিনটি। একটা জিনিস যদি ৩০০ টাকায় তৈরি হয়, বাজারে তার চেয়ে অনেক কম দামে সিনথেটিক পণ্য পাওয়া যায়। ফলে মানুষ বেতের জিনিস কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। সৌখিনতার কারণে কেউ কিনলেও সেটা এখন ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। রাসায়নিকের তৈরি এসব পণ্য আমাদের শিল্পকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু সিনথেটিকের পণ্য নয়, জায়গার সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ। আশপাশে একের পর এক কোচিং সেন্টার ও বহুতল ভবন গড়ে ওঠায় মালিকরা দোকান ভাড়া দিতে অনাগ্রহী। অনেক পুরোনো ভাড়াটিয়াদের অন্য কোথাও চলে যেতে বলা হয়েছে। মজুরি কম হওয়ায় দক্ষ কারিগররা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। একসময় যেখানে ৫০-৬০ জন কারিগর কাজ করতেন, এখন তিনটি দোকান মিলিয়েও পাঁচজন নেই।

বেতপণ্যের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, আগে আমার দোকানে চার-পাঁচজন কারিগর কাজ করতেন। এখন মাত্র একজন আছেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকা থেকে বেত আনতে হয়। সময়মতো সরবরাহ পাওয়া যায় না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।

‘বিষয়টি নজরে এসেছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য ভবিষ্যতে বিভিন্ন মেলায় প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আমরা চিন্তা করব।’

তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে আর্দ্রতার কারণে অনেক পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের খরচ বেড়েছে, কিন্তু বিক্রি কমে গেছে। এ অবস্থায় ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন।

এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট এখন দক্ষ কারিগরের অভাব। কম আয়ের কারণে নতুন প্রজন্ম বেতশিল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্যও ভেঙে যাচ্ছে।

কারিগরদের মতে, দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে এই শিল্পে টিকে থাকা সম্ভব নয়। একই সময়ে নিরাপত্তাকর্মী বা অটোরিকশা চালিয়েও এর চেয়ে বেশি আয় করা যায়। ফলে অনেকে পেশা পরিবর্তন করছেন। একসময় যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারিগররা পারিবারিকভাবে এ শিল্পে যুক্ত থাকতেন, এখন সেই ধারাও ভেঙে যাচ্ছে। সন্তানরা আর বাবার পেশা গ্রহণে আগ্রহী নয়।

আরও পড়ুন

মৌলভীবাজারে জনপ্রিয় হচ্ছে সিরাজের বাঁশের ফার্নিচার

কারিগর সোহাগ আলী বলেন, সারাদিন কাজ করে ৩০০ টাকা আয় হলে সংসার চলে না। অটোরিকশা চালালেও এর চেয়ে বেশি আয় করা যায়। তাই অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। নতুন ছেলেরা কেউ এই কাজ শিখতে চায় না।

‌‘এখন সবকিছু আধুনিকায়নের দিকে এগোচ্ছে। মানুষের রুচিরও পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে আধুনিক সিনথেটিকের তৈরি আসবাবপত্রের প্রতি মানুষের চাহিদা বেশি। যদি বেতশিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানো যায়, তাহলে বেতশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।’

স্থানীয়দের মতে, বেতশিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। অথচ বর্তমানে কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাঁচামাল সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা আধুনিক বিপণন উদ্যোগ না থাকায় শিল্পটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছে।

বেতপট্টির ব্যবসায়ী আজহার আলম বলেন, সরকারি সহযোগিতা ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সরবরাহে সহায়তা এবং বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলা ও প্রদর্শনীতে আমাদের পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হলে নতুন ক্রেতা তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বেতের তৈরি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও সম্ভাবনাময়। আধুনিক ডিজাইন, অনলাইন বিপণন এবং রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহীর বেতশিল্প আবারও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে।

অস্তিত্ব সংকটে হোসনিগঞ্জের বেতশিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররা

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য ভবিষ্যতে বিভিন্ন মেলায় প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে আমরা চিন্তা করব।

‘আগে বেতপট্টিতে ১৫-২০টা দোকান ছিল, এখন আছে মাত্র তিনটি। একটা জিনিস যদি ৩০০ টাকায় তৈরি হয়, বাজারে তার চেয়ে অনেক কম দামে সিনথেটিক পণ্য পাওয়া যায়। ফলে মানুষ বেতের জিনিস কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছে। সৌখিনতার কারণে কেউ কিনলেও সেটা এখন ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। রাসায়নিকের তৈরি এসব পণ্য আমাদের শিল্পকে নষ্ট করে দিচ্ছে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, বেতশিল্প বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু একটি কারুশিল্প নয়, বরং আমাদের ইতিহাস, নান্দনিক চেতনা এবং সামাজিক জীবনধারার প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, বেতশিল্পের মাধ্যমে একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকে। তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের বিস্তার, পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামালের সংকট এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, বেতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, বাজার সম্প্রসারণ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তাহলেই আমাদের এই মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও বিকাশ সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

চাকরি ছেড়ে বাঁশ-বেতের কারুশিল্পে স্বপ্ন গড়লেন সুইটি

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে আমরা রাজশাহীতে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। বেতশিল্পের প্রশিক্ষণ রাজশাহীতে নেই। ঢাকায় আমাদের ডিজাইন সেন্টার রয়েছে- সেখানে বাঁশ ও বেতশিল্প নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রাজশাহীতে এই প্রশিক্ষণ চালু করতে ঢাকায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও সরকারি প্রণোদনার বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখন সবকিছু আধুনিকায়নের দিকে এগোচ্ছে। মানুষের রুচিরও পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে আধুনিক সিনথেটিকের তৈরি আসবাবপত্রের প্রতি মানুষের চাহিদা বেশি। যদি বেতশিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানো যায়, তাহলে বেতশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

এনএইচআর/এএসএম