বাংলাদেশের অ্যাগ্রো প্রসেসিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও কোল্ড স্টোরেজের অভাব, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বহু সংস্থার নিয়ন্ত্রক জটিলতায় এ খাত কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না। এসব বাধা দূর করে ‘সিঙ্গেল ডোর সার্ভিস’ চালু এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক।

শনিবার (২৭ জুন) সকালে জাগো নিউজ আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন ইকতাদুল হক।

জাগো নিউজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক।

গোলটেবিল বৈঠকে অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পের বিভিন্ন সংকট ও সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরে বক্তারা বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মতো এ খাতেও রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। তবে নীতিগত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।

অ্যাগ্রো প্রসেসিংয়ে ‘সিঙ্গেল ডোর সার্ভিস’ জরুরি: ইকতাদুল হকজাগো নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ছবি: জাগো নিউজ

আলোচনায় বাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকতাদুল হক বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সারাবছর শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল নিশ্চিত করা যায় না। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশে উন্নত জাত ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে বছরজুড়ে ফল পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় উদ্যোক্তারা মাত্র দুই থেকে তিন মাস কাঁচামাল পান। এতে ব্যয়বহুল শিল্পকারখানা সারা বছর সচল রাখা সম্ভব হয় না।

ইকতাদুল হক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুবিধার কথা থাকলেও বাস্তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে অনীহা দেখায়। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সহজে ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নানা শর্ত ও জটিলতায় পড়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন না।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করলেও বিএসটিআই লাইসেন্স, খাদ্য নিরাপত্তা সনদ এবং অন্যান্য কমপ্লায়েন্সের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অনুমোদন ও নিবন্ধনের জটিলতায় অনেক উদ্যোক্তা বাজার সম্প্রসারণ কিংবা রপ্তানিতে যেতে পারছেন না।

আরও পড়ুন

ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ সারিতে, প্রক্রিয়াজাতকরণে নেই গতি

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা / প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বছরে নষ্ট হয় ২৫-৫০ হাজার কোটি টাকার ফল

রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও রেডিয়েশন সুবিধার সংকটের কথাও তুলে ধরেন ইকতাদুল হক। তার ভাষ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে মসলাজাতীয় পণ্য রপ্তানিতে রেডিয়েশন সেবা বাধ্যতামূলক হলেও দেশের বড় সরকারি রেডিয়েশন প্ল্যান্টটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ফলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি বাদামে আফলাটক্সিন ও চালে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মতো সমস্যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতে অ্যাগ্রো প্রসেসিং খাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় এবং ‘সিঙ্গেল ডোর সার্ভিস’ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে ১৮টি সংস্থার ২৩টি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে কাজ করতে হয়, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।

ইকতাদুল হক বলেন, অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্পে স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার প্রায় ৮০ শতাংশ বা তারও বেশি। ফলে এ খাত অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত নীতিমালা, সহজ সেবা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

অ্যাগ্রো প্রসেসিংয়ে ‘সিঙ্গেল ডোর সার্ভিস’ জরুরি: ইকতাদুল হকজাগো নিউজ আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা, ছবি: জাগো নিউজ

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।

ইএআর/এমএএইচ/এমএমএআর/এমএফএ