অ্যান্টার্কটিকা মানেই যেন মাইলের পর মাইল সাদা বরফ, পেঙ্গুইনের দল ও হাড়কাঁপানো শীতে জমে থাকা এক আদিগন্ত প্রান্তর। বর্তমানে কিছু গবেষণাকেন্দ্র ও মাঝেমধ্যে যাওয়া অভিযাত্রীদের দল ছাড়া এই মহাদেশে মানুষের কোনো স্থায়ী বসতি নেই। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বরফের রাজ্য সব সময় এমন ছিল না। প্রাগৈতিহাসিক যুগে এখানেও ছিল ঘন রেইনফরেস্ট, স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি ও বিশালদেহী ডাইনোসরদের রাজত্ব। কিন্তু প্রাচীন মানুষেরা যখন আফ্রিকা থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তত দিনে অ্যান্টার্কটিকা হয়ে উঠেছে বরফে মোড়া এক মৃতপ্রায় মহাদেশ। আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়া সেখানে মানুষের বেঁচে থাকাটা ছিল পুরোপুরি অসম্ভব।

তুমি যদি অ্যান্টার্কটিকার পুরোনো ইতিহাস ঘাঁটো, তবে দেখতে পাবে সেখানে মানুষের প্রথম পা পড়ার হিসাবটা বেশ গোলমেলে। মাওরিদের পুরোনো রূপকথায় এক অভিযাত্রীর নাম পাওয়া যায়—হুই তে রাঙ্গিওরা। বলা হয়, সপ্তম শতাব্দীর দিকে তিনি অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। সেই রূপকথায় তিনি এমন এক জায়গার বর্ণনা দিয়েছেন, যা কুয়াশাচ্ছন্ন, অন্ধকার এবং যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। তাঁর বর্ণনায় উঠে আসা সেই শূন্য ও বরফাবৃত পরিবেশ দেখে আধুনিক গবেষকেরা মনে করেন, তিনি হয়তো সত্যিই অ্যান্টার্কটিকার জলে নিজের নৌকার পাল তুলেছিলেন, হয়তো দূর থেকে মহাদেশটি নিজের চোখেও দেখেছিলেন।

কিন্তু সরকারিভাবে অ্যান্টার্কটিকা আবিষ্কারের প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ মেলে ১৮২০ সালে। রুশ অভিযাত্রী থাদিউস ভন বেলিংহসেন অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের সময় চরম উচ্চতার এক বরফের দেয়াল দেখার কথা তাঁর নথিতে উল্লেখ করেছিলেন। এরপরের দশক এবং শতাব্দীগুলোয় মানুষ এই মহাদেশ নিয়ে আরও অনেক অভিযান চালিয়েছে, যার অনেকগুলোতেই অভিযাত্রীদের নিজের জীবন দিয়ে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে।

সাইকেল চালিয়ে অ্যান্টার্কটিকা পাড়ি দিয়েছেন যিনি

ঠিক এ কারণেই একটি আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। আশির দশকে অ্যান্টার্কটিকায় মানুষের এমন এক দেহাবশেষ পাওয়া যায়, যাকে পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, মানুষটি মারা গিয়েছিল ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে। অর্থাৎ সরকারিভাবে অ্যান্টার্কটিকা আবিষ্কারের ঠিক আগে বা সেই একই সময়ে!

অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের মেরু মরুভূমি

আবিষ্কারের দিনটি ছিল ১৯৮৫ সালের ৭ জানুয়ারি। সময় বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিট। চিলি ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড্যানিয়েল তোরেস নাভারো কাজ করছিলেন কেপ উপকূলের ইয়ামানা সৈকতে। সমুদ্র থেকে ভেসে আসা নানা আবর্জনা ও নমুনা সংগ্রহ করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য। বালু ও পাথরের স্তূপের মধ্যে অর্ধেক পুঁতে আছে একটি মানুষের খুলি। অ্যান্টার্কটিকার মতো এক জনমানবহীন বরফের মহাদেশে মানুষের খুলি!

অধ্যাপক নাভারো তাঁর গবেষণাপত্রে এই আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর বর্ণনা দিয়েছেন। খুলিটির পেছনের অংশটুকু শুধু বালুর ওপরে দেখা যাচ্ছিল। সামনের অংশ, অর্থাৎ কপাল ও নাকের হাড়গুলো পুরোপুরি বালুতে ঢাকা ছিল। সামুদ্রিক মাইক্রোঅ্যালজি বা খুদে শেওলা জমে খুলির উন্মুক্ত অংশটা রীতিমতো সবুজাভ হয়ে গিয়েছিল। সাবধানে বালু সরিয়ে সেটি তোলার পর দেখা গেল, ওপরের চোয়ালের দুটি টুকরো এবং বেশ কয়েকটি মজবুত দাঁত এখনো অক্ষত আছে।

কিন্তু খুব ভালোভাবে খোঁজার পরও সামনের দিকের দুটো মূল দাঁত বা নিচের চোয়ালের কোনো অংশ সেখানে পাওয়া গেল না। আশপাশের বেশ কিছুটা এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও মেরুদণ্ড বা অন্য কোনো হাড়ের খোঁজ মিলল না।

অ্যান্টার্কটিকা থেকে সব বরফ সরিয়ে ফেললে কেমন দেখাবে পৃথিবী

কে ছিলেন এই তরুণী

খুলিটি ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হলো আসল চমক। প্রাথমিক পরীক্ষাতেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, এটি কোনো বয়স্ক মানুষের খুলি নয়। এটি একজন তরুণীর। কিন্তু আজ থেকে ২০০ বছর আগে, যখন ওই মহাদেশের কথা সভ্য জগৎ ঠিকমতো জানতই না, তখন একজন তরুণী সেখানে কী করছিলেন?

অ্যান্টার্কটিকার মতো জায়গায় একটি খুলি পেয়েই তো আর বসে থাকা যায় না। তোরেস নাভারো এবং তাঁর দল পরের কয়েক বছর ধরে ওই একই সৈকত এবং আশপাশের এলাকায় বারবার ফিরে গেছেন। তাদের সেই পরিশ্রম বৃথা যায়নি। সৈকতের কাছাকাছি অন্য একটি জায়গা থেকে তারা একটি ঊরুর হাড় খুঁজে পান। এরপর বিজ্ঞানীদের দল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে মেয়েটির শরীরের অন্যান্য হাড় হয়তো এই ইয়ামানা সৈকতের বিশাল এলাকাজুড়ে এভাবেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

খুলির গঠন ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য বের করেন। তরুণীটি সম্ভবত চিলির অধিবাসী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে। তাহলে কি রুশ অভিযাত্রী থাদিউস ভন বেলিংহসেনের আগেই এই তরুণী অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছেছিলেন?

অ্যান্টার্কটিকা কবে মহাদেশে পরিণত হলো

মৃত্যুর কারণ নিয়ে যত জল্পনা

অধ্যাপক নাভারো এ রহস্যের সমাধানের জন্য দুটি সম্ভাব্য তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। প্রথমটি হলো, কোনো অজানা কারণে ওই তরুণী হয়তো উনিশ শতকের একদল সিল শিকারির সঙ্গে ওই অঞ্চলে এসেছিলেন। হয়তো তারা অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি কোনো দ্বীপে বা উপকূলে নোঙর করেছিল। এরপর হয়তো শিকারিদের দল কোনো কারণে মেয়েটিকে একা সেই বরফের মৃত্যুপুরীতে ফেলে রেখে চলে যায়।

তবে দ্বিতীয় তত্ত্বটি আরও বেশি বাস্তবসম্মত এবং রোমাঞ্চকর। সে যুগে সমুদ্রযাত্রায় কেউ মারা গেলে তাকে সমুদ্রে সমাহিত করাই ছিল নিয়ম। হয়তো এই তরুণী কোনো এক জাহাজের যাত্রী ছিলেন। পথে তাঁর মৃত্যু হলে জাহাজ থেকেই তাঁর মৃতদেহ সাগরের হিমশীতল জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর হয়তো কোনো এক প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড় বা ঢেউয়ের তোড়ে মৃতদেহটি ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকে অ্যান্টার্কটিকার এই ইয়ামানা সৈকতে।

এরপরের দৃশ্যপটটি বেশ ভয়ংকর। অ্যান্টার্কটিকার এই সৈকতে মৃতদেহ খেয়ে বেঁচে থাকে এমন অনেক পাখি আছে। জায়ান্ট পেট্রেল, স্কুয়া, কেল্প গাল ও শিথবিলের মতো পাখিরা হয়তো সেই মৃতদেহটিকে খুঁজে পায়। মাংস খাওয়ার সময় এই ক্ষুধার্ত পাখিদের টানাটানিতেই হয়তো খুলিটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। নিচের চোয়াল ও দাঁতগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনেও এই পাখিদেরই হাত থাকতে পারে। এরপর বছরের পর বছর ধরে হাড়গুলো পুরো সৈকতে ছড়িয়ে পড়ে এবং বালুর নিচে চাপা পড়ে যায়।

ঘটনার পেছনের আসল সত্য হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা যাবে না। মেয়েটি কি সত্যি সত্যিই জীবিত অবস্থায় অ্যান্টার্কটিকার মাটিতে পা রেখেছিলেন, নাকি তাঁর মৃতদেহ সাগরের স্রোতে ভেসে এসেছিল? সেই উত্তর আজন্মকাল বরফের নিচেই চাপা পড়ে থাকবে। তবে যেভাবেই আসুক না কেন, আজ পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকার মাটিতে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো মানবদেহের চিহ্ন হিসেবে এই তরুণীর খুলিটিই ইতিহাসে একটা স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

অ্যান্টার্কটিকা শেষ কবে বরফহীন ছিল