২০২৪-এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের জোর দাবি উঠলেও শেরপুর জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনকারী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতাদের অনেকেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ওইসব স্বাচিপ নেতার অনেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন অফিসে সদর্পে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ২০১৮ সালে শেরপুর জেলা হাসপাতাল মিলনায়তনে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সে কমিটির প্রভাবশালী চিকিৎসকদের কেউ কেউ এখনো আগের মতোই বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ২০২৪ সালে স্বাচিপের সর্বশেষ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে একটি খসড়া তালিকা তৈরি হলেও ৫ আগস্টের পর সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। সূত্র মতে, জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্রে ২০১৮ সালের সেই স্বাচিপ কমিটির শীর্ষ নেতারাই একটি অলিখিত জোট তৈরি করে নীতিনির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো শক্তভাবে ধরে রেখেছেন। অনুসন্ধান ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, এ পুরো সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি ও নেপথ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া। তিনি মূলত ২০১৮ সালে গঠিত হওয়া স্বাচিপ জেলা শাখার নির্বাহী কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সদস্য ছিলেন। হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার দরপত্র, কেনাকাটা, ওষুধ বণ্টন এবং আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আর্থিক সংশ্লেষযুক্ত বিষয়গুলো সরাসরি তারই তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। ডা. সেলিম মিয়া ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর স্থানীয় সময় টিভির সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ন্যক্কারজনক ঘটনায় তার বিরুদ্ধে জেলার সর্বস্তরের সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময়ে তার অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল হয়। গণরোষের মুখে তিনি কিছুদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে পলাতক অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু পরে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে পুনরায় আবির্ভূত হন। ওই স্বাচিপ সিন্ডিকেট? পরিকল্পিতভাবে বর্তমানে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত এবং ওষুধ ও জনবলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে হাসপাতালের ভেতরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ডা. সেলিম মিয়ার এ প্রভাব বলয়ের অন্যতম সহযোগী স্বাচিপের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. মোবারক হোসেন। বিগত সরকারের সময় ডা. মোবারক হোসেন ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার। বর্তমানে রয়েছেন জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসাবে। একই সিন্ডিকেটের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক হিসাবে কাজ করছেন ওই কমিটির সহ-সভাপতি ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর এবং স্বাচিপের জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ডা. নাহিদ কামাল কেয়া। ডা. কেয়া পতিত সরকারের সময় জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসারের দায়িত্বকালীন সময় তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ডা. কেয়ার মা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ছিলেন। সে কারণে তার বেশ দাপট ছিল। তার মা শামসুন্নাহার কামাল ৫ আগস্টের পর থেকে পালিয়ে রয়েছেন। এ বিষয়ে ডা. কেয়া বলেন, ‘২০১৮ সালের কমিটির পরে আমাকে আর স্বাচিপ কমিটিতে রাখেনি। আর আমিও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার মায়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক স্থানীয় এমপি ও হুইপ আতিউর রহমান আতিকের দ্বন্দ্বের কারণে আমাকেও কোণঠাসা করে রেখেছিল।’ এছাড়া তৎকালে হাসপাতালের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কথাও তিনি অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে সাবেক স্বাচিপ নেতা ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া বলেন, ‘ওই সময় যারা সরকারি চাকরি করতেন তাদের স্বাচিপের সদস্য হতে বাধ্য করা হতো। তাই আমাকে সদস্য করা হয়েছিল। তবে ওই কমিটির পর থেকে আমার স্বাচিপের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই।’ এছাড়া হাসপাতালের তারা নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা তিনি অস্বীকার করেন।