দেশের আম চাষিদের বরাবরই একটি অভিযোগ থাকে—আম চাষে উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা ন্যায্য মূল্য পান না। এর অন্যতম কারণ মৌসুমে আমের সরবরাহ থাকে বেশি। ফলে আমের দাম কমে যায়। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা আমের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। ‘বারি আম-১৯’ নামের আম চাষে সুবিধা হলো, এটি মৌসুমের শেষের দিকে, অর্থাৎ আগস্টে ফলন দেবে। ফলে বাজারে তখন আমের সরবরাহ কম থাকায় চাষিরা ভালো দাম পাবেন।
দেশের আম গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের গবেষকরা এখন পর্যন্ত ১৬টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন। দেশের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে আরও দুটি জাত। তবে সম্প্রতি নতুন একটি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বারি আম-১৯’। জাতটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। গবেষকদের আশা, অনুমোদন পেলে আগামী মৌসুমে এ জাতের গাছের চারা পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
আরও পড়ুন
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা / প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে বছরে নষ্ট হয় ২৫-৫০ হাজার কোটি টাকার ফল
গবেষকরা বলছেন, দিন দিন ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আম চাষিরা। এর অন্যতম কারণ, একই সময়ে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে চলে আসায় সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে দাম কমে যায়। এ সমস্যা সমাধানে বারি আম-১৯ জাত নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, জাতটি স্বাদে ভালো হওয়ার পাশাপাশি মৌসুমের শেষের দিকে, অর্থাৎ আগস্ট মাসে ফলন দেবে। ফলে বাজারে আমের সরবরাহ কম থাকায় চাষিরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে নতুন কোনো জাতের আম নিয়ে কাজ করা চাষিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান শিবগঞ্জ প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম।
‘দেশের আম গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের গবেষকরা এখন পর্যন্ত ১৬টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন। দেশের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে আরও দুটি জাত। তবে সম্প্রতি নতুন একটি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বারি আম-১৯’। জাতটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে’
এর কারণ হিসেবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শুধু দেখতে সুন্দর হলেই বা ফলন বেশি হলেই একটি জাতকে সফল বলা যায় না। নতুন জাতের আমের স্বাদ, গন্ধ, রং, সংরক্ষণ ক্ষমতা, পরিবহন উপযোগিতা, রোগবালাই প্রতিরোধের সক্ষমতা এবং বাজারে এর চাহিদা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
আরও পড়ুন
দেশে আম রপ্তানির জন্য বাধ্যতামূলক ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ এখনো সীমিত
ইসমাইল খান বলেন, ‘অনেক সময় গবেষণাগারে একটি জাত ভালো ফল দিলেও মাঠ পর্যায়ে চাষিরা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই নতুন জাত কৃষকের কাছে দেওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। অন্তত দুই বছর বিভিন্ন এলাকার মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি যাচাই করতে হবে। এরপর চাষিদের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাষিদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নতুন জাতের আম বাজারে আনার আগে এর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি নতুন জাতের ওপর কৃষকের বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ আয়ের বিষয় জড়িত থাকে। সঠিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর জাতটি সম্প্রসারণ করা হলে চাষিরা লাভবান হবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বারি-৪। স্বাদ, গুণগত মান, উৎপাদন ক্ষমতা ও বাজার চাহিদার কারণে এই জাতটি এরইমধ্যে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।’
‘এটি মৌসুমের শেষের দিকে, বিশেষ করে আগস্টের দিকে বাজারে আসবে। সাধারণত এ সময়ে বাজারে আমের সরবরাহ কমে যায়। ফলে চাষিরা যদি এসময়ে আম বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে তারা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন’
তিনি বলেন, ‘বারি উদ্ভাবিত অন্যান্য জাতের আম থাকলেও সেগুলোর চাহিদা বাজারে তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে নতুন জাতের আম নিয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বারি-১৯ জাতের আম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। জাতটি বাজারে এলে চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
সংরক্ষণাগার-সার্টিফিকেশনের অভাবে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার টন আম
বারি-১৯ জাতের আম চাষের সুবিধা প্রসঙ্গে আব্দুল হালিম বলেন, ‘এটি মৌসুমের শেষের দিকে, বিশেষ করে আগস্টের দিকে বাজারে আসবে। সাধারণত এ সময়ে বাজারে আমের সরবরাহ কমে যায়। ফলে চাষিরা যদি এসময়ে আম বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে তারা তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা। তিনি বলেন, ‘আমকে ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নতুন নতুন জাতের আম উদ্ভাবনের ফলে অনেক সময় আগের ঐতিহ্যবাহী জাতগুলোর চাহিদা ও দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।’

তিনি বলেন, ‘নতুন জাতের আম বাজারে আনার পাশাপাশি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী আমগুলোর কদর ধরে রাখার বিষয়েও নজর দিতে হবে। কারণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের নিজস্ব ঐতিহ্য ও বাজারমূল্য রয়েছে। নতুন জাতের কারণে যেন পুরোনো জাতগুলো হারিয়ে না যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
‘বারি উদ্ভাবিত অন্যান্য জাতের আম থাকলেও সেগুলোর চাহিদা বাজারে তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে নতুন জাতের আম নিয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বারি-১৯ জাতের আম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। জাতটি বাজারে এলে চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে’
শারজানা আক্তারের ভাষ্য, ‘বারি-১৯ জাতের আম যেহেতু মৌসুমের শেষের দিকে বাজারে আসবে, তাই এটি চাষিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এ সময়ে বাজারে আমের সরবরাহ কম থাকে। ফলে চাষিরা ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন।’
আরও পড়ুন
পাহাড়ে বিদেশি আম চাষে নতুন সম্ভাবনা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে আমসহ বিভিন্ন ফলের জাত উন্নয়ন ও কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে আসছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন। বুধবার (৮ জুলাই) জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে এই গবেষক বলেন, ‘আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল। এ জেলার কৃষি অর্থনীতি মূলত আমকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। জেলার লাখো কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমের ওপর নির্ভরশীল।’
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম চাষে খরচ বেড়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। এর অন্যতম কারণ হলো—একই সময়ে বাজারে বিভিন্ন জাতের আম উঠে আসায় সরবরাহ বেড়ে যায়। এতে দাম কমে যায়। এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। আম চাষকে আরও লাভজনক ও আধুনিক ধারায় নিয়ে যেতে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
ড. শরফ উদ্দিন বলেন, ‘চাষিদের কথা বিবেচনা করেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে বারি-১৯ জাতের আম উদ্ভাবন করা হয়েছে। নতুন এই জাতের উৎপাদন ক্ষমতা, স্বাদ, সংরক্ষণ ক্ষমতা, রোগবালাই প্রতিরোধের সক্ষমতা এবং দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে জাতটি অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে।’
আগামী মৌসুমে অনুমোদন পাওয়া গেলে চাষিদের মধ্যে বারি-১৯ জাতের চারা সরবরাহ করা হতে পারে বলে জানান এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন
হিমসাগর-ল্যাংড়াকে হটিয়ে ‘সেরা’ আম এখন আম্রপালি
তিনি বলেন, নতুন কোনো জাত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে চাষিদের পরামর্শ, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং সঠিক পরিচর্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জাতটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শঙ্কায় মৌসুমি চাষিরা
তবে নতুন জাত নিয়ে শঙ্কার কথা জানান কানসাট ইউনিয়নের আমচাষি উমর আলী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নতুন নতুন নাবিজাত আসার কারণে আম চাষ করে দীর্ঘদিন ধরেই লোকসান গুনছি। আমাদের সুপরিচিত মৌসুমি আম ধ্বংসের পথে। তাই নতুন আম গাছ বাজারে আনার আগে শতবার পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে আম্রপালির প্রভাবে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে পড়েছে ফজলি। কিন্তু বিগত দিনে ফজলি আমের দাপট ছিল ব্যাপক। ফলে এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ফজলি আম চাষিরা।’
অনলাইনে বাড়ছে ফল বিক্রির জনপ্রিয়তা, বাড়ছে কর্মসংস্থান
শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের আমচাষি মজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বছরই নতুন নতুন জাতের আম আসছে। এতে আমাদের মতো মৌসুমি আম চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একবার আমগাছ লাগালে সেটি থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। তাহলে প্রতিবছর কেন নাবি জাতের আম গাছ উদ্ভাবন করতে হবে? তবে শুনছি বারি-১৯ জাতের আম মৌসুমের শেষের দিকে বাজারে আসবে। এতে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’
এসআর/এএসএম








