স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়া সহনশীল মানসম্পন্ন বীজ, চারা, কলম উৎপাদনের পর তা সুলভ মূল্যে কৃষকের মাঝে সরবরাহের কথা থাকলেও উল্টো ঘটছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালিত কেন্দ্রটির উপপরিচালক (ডিডি) মো. মাহবুবুর রশীদ চারা উৎপাদন না করে বাইরের জেলার নার্সারি থেকে বিভিন্ন ফলদ চারা কিনেছেন। এরপর তা বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পে বিক্রি দেখিয়ে টাকা পুরছেন নিজ পকেটে। আর পার্বত্য অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার অনুকূল নয়— এমন চারা কিনে বিতরণ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। এমনকি বিতরণের জন্য আনা এসব চারা হর্টিকালচার সেন্টারে মারা যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘বিল্ডিং ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট লাইভলিহুডস ইন ভালনারেবল ল্যান্ডস্কেপ ইন বাংলাদেশ’ (বিসিআরএল) প্রকল্প বাস্তবায়নের অঞ্চল হিসেবে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলাকে নির্বাচন করা হয়। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ খাড়া পাহাড়ি এলাকা ও পাহাড়ি মাটি ক্ষয়প্রবণ এলাকা হিসেবে নির্বাচিত উপজেলাটিতে প্রকল্পের আওতায় চারটি জাতের ১ লাখ ২০ হাজার আমের চারা বিতরণ কথা রয়েছে। ১ হাজার ২০০ জন কৃষকের মাঝে এসব চারা বিতরণ করার কথা। এ ছাড়া হর্টিকালচার সেন্টারটির কৃষি গুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের ড্রাগনের চারা বা আম পরিচর্যা ও সংরক্ষণের সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের প্রশিক্ষণও দেওয়ার কথা রয়েছে। এ জন্য গত মে মাসে ঘূর্ণমান তহবিল থেকে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় হর্টিকালচার সেন্টারটি।

বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, মাহবুবুর রশীদ বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন গত ১২ জানুয়ারি। তিনি যোগদানের পরপরই সেন্টারে উৎপাদনের পরিবর্তে চারা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি গত ছয় মাসে বাইরের জেলা থেকে চারা কিনে এনে কেন্দ্রটিতে বিক্রি দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। এ নিয়ে কথা বলায় কর্মচারীদের বদলির হুমকি দিচ্ছেন।

বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের দুজন কর্মী মো. রবিউল ও মিল্টন চাকমার সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের অভিযোগ, সেন্টারে চারা উৎপাদন না করেও খরচ দেখানো হয়েছে। বাইরে থেকে এনে মজুত করা চারার বেশির ভাগই মরে যাচ্ছে। এ অনিয়ম ধামাচাপা দিতে অফিসের সবাইকে বদলির হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে নিজ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রেখে মাহবুবুর রশীদ জেলার পাঁচটি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে বিনা মূল্যে চারা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সদর উপজেলার আসাম বস্তি হর্টিকালচার সেন্টারের উপসহকারী উদ্যান কর্মকর্তা (এসএএও) মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘মাহবুবুর রশীদ আমাদের থেকে ৪৫০টি ফলদ চারাসহ অন্যান্য চারা নিয়েছেন, কিন্তু তিনি কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি। এমনকি উল্টো ৫০ হাজার টাকা চেয়েছেন। না দিলে বদলির হুমকি দেন। আমি স্যারকে বলেছি, টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার নাই। যেখানে মন চায় সেখানে যেন বদলি করে দেন।’

এ ছাড়া লংগদু, বালুখালী, কাপ্তাই ও নানিয়ারচর উপজেলার হর্টিকালচার সেন্টার থেকেও কোনো টাকা না দিয়েই প্রায় ৩ হাজার ফলদ চারা নেওয়ার কথা জানান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

প্রকল্পের আওতায় কৃষকের মাঝে চারা বিতরণ প্রসঙ্গে কাউখালীর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. তৈয়ব বলেন, ‘চারাগুলো জাত নিয়ে আমরা শতভাগ নিশ্চিত নই। তবে এগুলো বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের উৎপাদিত নয়।’

কাউখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাসেল সরকার বলেন, ‘ডিডি স্যার চারা সরবরাহ করছেন, আমরা তা বিতরণ করছি। তবে কোথা থেকে আনা হচ্ছে বা মান কেমন, তা জানার সুযোগ নেই। আম্রপালি, বারি-৪, কাটিমন এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো—এই চার জাতের চারা দেওয়া হচ্ছে, শুধু এটা জানি।’

অবসরপ্রাপ্ত কৃষিবিদ পবন কুমার চাকমা বলেন, বাইরের নার্সারি থেকে চারা এনে পার্বত্য অঞ্চলে বিতরণ করা হলে এতে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিজস্ব চারা উৎপাদন না করে বাইরে থেকে চারা এনে বিতরণ দেখানো আইনবহির্ভূত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বনরূপা হর্টিকালচার সেন্টারের ডিডি মাহবুবুর রশীদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঘূর্ণমান তহবিলের টাকা দিয়ে আমি আমার হর্টিকালচারে চারা উৎপাদন করিনি—ঠিক আছে। যে সময়ে আমি টাকা নিয়েছি, এই সময়ের মধ্যে চারা উৎপাদন করে কৃষকের মাঝে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না।’

মাহবুবুর রশীদের দাবি, ‘এই টাকা দিয়ে আমি বাইরে থেকে দেখেশুনে, আমার লোক পরীক্ষা করে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে চারাগুলো কিনে কৃষকের মাঝে বিতরণ করেছি। চারার মান নিয়ে কোনো অভিযোগ এ পর্যন্ত আসেনি।’

কর্মচারীদের বদলির হুমকির অভিযোগ প্রসঙ্গে মাহবুবুর রশীদ বলেন, ‘অনেককে দেখেছি, কোনো কাজের না। তাঁদের বদলির ব্যবস্থা করায় আমার ওপর ক্ষুব্ধ।’

রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (ডিডি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির কাজটি আগে করতেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণের ডিডি। নতুন কোনো আইন তৈরি হয়েছে কি না, আমার জানা নেই।