বান্দরবানে টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও বন্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে ও পাহাড় ধসে সাতজন নিহত হয়েছে। এছাড়াও ৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতায় ২৪৭২ হেক্টর আবাদি জমির ফসল ও ১৫১ কিমি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানিবন্দি হয়েছেন প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার। তবে পানি কমতে থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছে প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বান্দরবান জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস।
এসময় লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একপর্যায়ে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার সর্বোচ্চ আড়াই মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তবে, মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ দশমিক ৪৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৩ দশমিক ৭১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন স্থানে ৪৭টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১১টি বড় ধরনের। পাহাড় ধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় অধিকাংশ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে লামা উপজেলায়। সেখানে দুটি পৃথক পাহাড় ধসে পাঁচজন নিহত হন। এছাড়া বান্দরবান সদর ও নাইক্ষ্যংছড়িতে পানিতে ডুবে নিহত হন আরও দুজন। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত জনে।
এদিকে অতিবৃষ্টিতে সওজের আওতায় ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডি ও স্থানীয় সরকারের আওতায় আরও ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চারটি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এর মধ্যে একটি সচল করা হয়েছে। বাকি তিনটির সংস্কারকাজ চলছে।
জেলায় প্রস্তুত রাখা ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ২ হাজার ৫৮২ জন। এছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লামা পৌর এলাকা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলা। জেলার ৩৪টি ইউনিয়ন দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার ৪০০ টন চাল, ৪০ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ দিয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী, ৮৭৫ প্যাকেট শিশু খাদ্য ও তিন লাখ টাকা নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া, পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিদিন দুই বেলা করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে আরও তিন হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।
দুর্যোগের সময় থানচিতে ১৬৭ জন এবং রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েন। পরে বিজিবির সহায়তায় আমিয়াখুমে আটকে পড়া চারজন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পৌরসভা, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
৮ দিনের বন্যায় ডুবেছে কক্সবাজারের ৪৯ শতাংশ, প্রাণহানি ৩২
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করবেন। প্রত্যাবর্তনের সময় প্রতিটি পরিবারকে অন্তত দুই দিনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং গৃহ নির্মাণ সহায়তার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া বন্যা-পরবর্তী পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ের পাদদেশে নিরাপদ আবাসন নির্মাণ, অবৈধ পাহাড় কাটা রোধ ও বান্দরবান শহরের ম্যাকসি খাল সংস্কারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
এসময় অন্যান্যের মধ্যে পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস, এম, মনজুরুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন মাসুম, বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চুসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
নয়ন চক্রবর্তী/কেজে/এএসএম







