চারদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। আড়াই হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার (৮ জুলােই) রাত ৮টা পর্যন্ত বান্দরবান সদরে ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৬৭০ জন অবস্থান করছেন। অন্যান্য উপজেলায় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষের সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। 

সরেজমিনে দেখা যায়, টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিলালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া ও মেম্বারপাড়াসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কোমর থেকে গলা সমান পানি জমে রয়েছে। এতে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে গেছেন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ উঁচু সড়কের পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে থাকছেন।

বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া হোসনে বেগম জানান, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাত দুইটার দিকে তিনি প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন। তার বসতঘর পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দুই সন্তানকে নিয়ে তাকে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

একইভাবে পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মনিকা বড়ুয়া জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করে। বিদ্যুৎ না থাকায় মালামাল সরাতে খুব কষ্ট হয়েছে এবং বড় জিনিসপত্র বের করতে পারেননি। সকালে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন।

একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ঝর্না রাণী দাশ জানান, তার বসতঘরও বন্যায় তলিয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৯১টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তিনি জানান, পৌরসভা থেকে দুপুরে খিচুড়ি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়েছে।

মারমা বাজার নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা মংমে মারমা বলেন, ভারী আসবাবপত্র রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা থাকায় তারা সড়কের পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে অবস্থান করছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার হলেও বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পানি ১১ দশমিক ৯৮ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ৮০ মিটার অতিক্রম করে ১৬ দশমিক ০৬ মিটার উচ্চতায় পৌঁছায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত) জেলায় ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, “পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে।”

তিনি জানান, জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।

বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি খাদ্যসামগ্রী চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।