আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতি মো . সাহাবুদ্দিনকে অপসারণে আন্দোলন হয়েছিল নির্বাচনের আগে । আর নির্বাচনের পর থেকে বেশ জল্পনাকল্পনা চলছিল বিএনপি কাকে নতুন রাষ্ট্রপতি বানাচ্ছে , তা নিয়ে । সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মাধ্যমে সেই জল্পনাকল্পনা আরও জোর পেল । বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হতে যাচ্ছেন , তা জানতে আগ্রহী সবাই । শারীরিক ও মানসিক অসমর্থ্যের কথা উল্লেখ করে গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন ।
ক্ষমতাসীন দল হিসেবে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ( বিএনপি ) জ্যেষ্ঠ নেতাদের নাম । পাশাপাশি দলের বাইরে থেকে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপ্রধান পদে আনার গুঞ্জনও রয়েছে । অবশ্য বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে এখনো দায়িত্বশীল কোনো মন্তব্য করছেন না দলের নীতিনির্ধারকেরা । বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে , দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে দলীয় ফোরামে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর । বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন
বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তিনি । বর্তমানে সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকই রাষ্ট্রপতি পদের অন্যতম দাবিদার বলে মনে করেন দলের নেতাদের একটা অংশ । দীর্ঘদিনের রাজপথের সংগ্রাম , সংকটকালে দলকে সুসংগঠিত রাখা এবং সব মহলে সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তির কারণে দলীয় হাইকমান্ড ও নেতা - কর্মীদের পছন্দের তালিকায় তাঁর নামই শীর্ষে ।
তবে মির্জা ফখরুল ছাড়াও দলের ভেতরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে আরও বেশ কয়েকটি জ্যেষ্ঠ নাম ঘুরেফিরে আসছে । তাঁদের মধ্যে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য সাবেক মন্ত্রী ড . খন্দকার মোশাররফ হোসেন । দীর্ঘ সংসদীয় ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে সাংবিধানিক পদে তাঁকে অনেকে যোগ্য ভাবলেও তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত কী হবে , তা নিয়ে হিসাব- নিকাশ চলছে । বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও আলোচনার বাইরে নয় । শ্রমিক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতিক ( সাবেক রাষ্ট্রদূত ) হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা সাংবিধানিক এই পদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে । দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আবদুল মঈন খানের নামও আছে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আলোচনায় ।
এদিকে দলের সংকটাপন্ন সময়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পুরস্কার হিসেবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকেও বিবেচনা করা হতে পারে বলে দলীয় কোনো কোনো সূত্রের আভাস । রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির একটি সূত্র ভিন্ন এক সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে । সূত্রটির দাবি , বঙ্গভবনের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার বড় একটি চমক দেখতে পাওয়া যেতে পারে । স্বাধীনতার পর দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী এলেও এ পর্যন্ত কোনো নারী রাষ্ট্রপতি দেখেনি বাংলাদেশ । সেই সমীকরণ বিবেচনায় রেখে আলোচনায় আনা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের নাম ।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে কেবল দলীয় রাজনীতিকদের নামই নয় , দলের বাইরে থেকেও বেশ কয়েকজন হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিত্বকে ঘিরে চর্চা চলছে । অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড . মুহাম্মদ ইউনূসের নাম রাজনীতি ও সুশীল সমাজের সংলাপে বেশ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে । বিচার বিভাগের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও গুঞ্জনে রয়েছে । অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছেন কেউ কেউ । যদিও রাষ্ট্রপতি পদটি এবার দলের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা । নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা রাখেন বিএনপির এমন একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করে আজকের পত্রিকাকে জানান, দলের ভেতর থেকেই হবেন রাষ্ট্রপতি । দলের বাইরে থেকে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম । তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন কথাও বলছেন তাঁরা ।
এক নেতা মন্তব্য করেন , ‘রাষ্ট্রপতি দলের ভেতর থেকেই নির্বাচিত হবেন । ' আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে রসিকতার সুরে বলেন , ‘ বিএনপি আর পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে নিয়ে আগাম অনুমান করা সত্যিই কঠিন । বিএনপির সিদ্ধান্ত অনেক সময় সই হওয়ার পর কাগজ জমা দেওয়া পর্যন্ত বদলে যায় ! ’ সংবিধান অনুযায়ী , রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে । নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন । যদি বিএনপি একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে , তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন । এখন দেখার বিষয় — রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশলগত হিসাব মেলাতে বিএনপি বঙ্গভবনের জন্য তাঁদের কাকে বেছে নেয় ।








