ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ঘোলাটে পরিস্থিতিতে বিগত কয়েক মাসে খুব ভালোভাবেই জ্বালানি সংকট টের পেয়েছে বাংলাদেশ। আর সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাচ্ছে বিএনপি সরকার। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা পূরণ এবং ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের তৎপরতা শুরু হয়েছে এরইমধ্যে।
সম্প্রতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে এই খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে দীর্ঘদিন পর নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড বা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সরকার তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বৃদ্ধি, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, পরিশোধন সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি জানান, প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদনে অনশোর (স্থলভাগ) এবং অফশোর (সমুদ্রাঞ্চল) উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন
সিপিডি / সামান্য বরাদ্দে সরকারের ২০৩০ সালের জ্বালানি রূপান্তর লক্ষ্য অসম্ভব
সরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশের আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে প্রায় ২২ দশমিক ১১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট মজুত রয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ, যা বর্তমান উৎপাদন হারে আরও প্রায় এক দশকের কিছু বেশি সময় দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলো সরকার।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পাশাপাশি মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৪ শতাংশ পূরণ করা হচ্ছে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। এলপিজির প্রায় পুরো চাহিদাই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশের জ্বালানি খাত চাপের মুখে পড়ে।
আরও পড়ুন
তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিজস্ব উদ্যোগে ৬৯ কূপ খনন করবে সরকার
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার চলমান কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ২৬টি কূপে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ মেয়াদে ৬৯টি নতুন কূপ খনন এবং ৩১টি কূপে ওয়ার্কওভার কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে দুটি নতুন এক্সপ্লোরেশন রিগ সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২৭০ লাইন কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক জরিপ এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক দরপত্র ঘোষণা
অনুসন্ধান কার্যক্রমে কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতিও অর্জিত হয়েছে বলে জানা গেছে। বাপেক্স ব্লক-৭ ও ব্লক-৯ এলাকায় প্রায় ৩৬০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক ডাটা সংগ্রহ সম্পন্ন করেছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।
দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সরকার সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র ঘোষণা করেছে। ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’র আওতায় মোট ২৬টি সমুদ্র ব্লক বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্র ব্লক এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক রয়েছে। কিছু সরকারি তথ্যে ২৭টি ব্লকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক অন্তর্ভুক্ত।
আরও পড়ুন
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি উৎস বহুমুখীকরণের ওপর জোর
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছি। গ্যাস অনুসন্ধানে ১৫০টি নতুন কূপ খননের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দেশীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’
আরও পড়ুন
সন্ধ্যায় শপিংমল-দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ধস, ধাক্কা বৈশাখী বাজারেও
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুত আবিষ্কৃত হলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সক্ষম হবে। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট করতে সরকার উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) সংশোধন করেছে। নতুন চুক্তিতে বিনিয়োগ সুরক্ষা, তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ, নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির অনুমতি এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা রাখা হয়েছে। তাছাড়া স্থল ও সমুদ্র উভয় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন গ্যাস মজুত আবিষ্কার সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সফল হলে শুধু আমদানিনির্ভরতা কমবে না, বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে। তবে এজন্য অনুসন্ধান কার্যক্রমের গতি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
আরও পড়ুন
গ্যাস অনুসন্ধান-নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিতে হবে
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এক নম্বর প্রয়োরিটি হচ্ছে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম। সরকার সেই পথেই এগিয়েছে। এটিই হওয়ার কথা ছিল। এখন বিষয়টা হচ্ছে অনুসন্ধান চালালেই যে আমরা গ্যাসের সন্ধান পাবো তেমনটা নয়, নাও পেতে পারি। আবার অফসোরে দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে। কারা আসবে, আসলে কীভাবে কাজ করবে সেটিরও অনেক প্রক্রিয়া আছে।
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, আমাদের কী পরিমাণ গ্যাসসম্পদ আছে আমরা সেটা জানি না। এই কার্যক্রমের পর আমরা স্পষ্ট ধারণা পাবো, আমাদের সম্পদ আছে কি নেই। থাকলে তো ভালো, আমরা সেটি উত্তোলন করে কাজে লাগাতে পারবো। আর যদি না থাকে তাহলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া যাবে।
এনএস/এসএনআর/এমএফএ








