আষাঢ় বাংলা সনের তৃতীয় এবং বর্ষার প্রথম মাস। বৃষ্টির একটানা কম্পনে মনে ভেসে ওঠে কালিদাসের ‘আষাঢ়্য প্রথম দিবসে’ কিংবা ‘বঁধু এমন বাদল দিনে তুমি কোথা’ আকুতির সংরচন। এ ঋতুর ফুল-ফল, রূপ-রস গন্ধ ও ছন্দের ঝংকার আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের স্মারক। বর্ষা তাই শুধু জল, কাদা আর মেঘের গর্জন নয়। বরং এক বাহারি শুভ্রতার উৎসব। রঙবাহারি আয়োজনের ঘন-ঘটায় সজীব এ মাসে প্রকৃতি নিজের আলাদা বৈচিত্র্য প্রকাশ করে। নিকষ-কালো মেঘের উদাসী বাউরি বিচরণের মাঝে চমকায় বিজলি। অবিচ্ছিন্ন বারিপতনে ভরে যায় চারপাশ। বর্ষার এই সিক্ত-স্নিগ্ধ জল হাওয়ার সংরাগে প্রকৃতিতে ফোটে কদম, কেয়া, শাপলা ও বেলিসহ নানা জাতীয় ফুল। অনিবর্চনীয় সুন্দরের বর্ণিল সম্ভারের মৃদু স্পর্শে বাঙালি হৃদয় গভীর নস্টালজিয়া ও রোমান্টিক চেতনার জড়িমা পরে। জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড খরতাপে রুক্ষ প্রকৃতি বারিবর্ষণের ছোঁয়ায় সিক্ত ও বিগলিত হয়ে ওঠে। সময়ের এ প্রতিবেশ শুধু প্রকৃতিকে নয় মানব হৃদয়কেও করে তোলে ব্যাকুল প্রণয়পিয়াসী। আষাঢ় মাস, তাই বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে একান্ত হয়ে মিশে আছে। ফলে বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি মানব হৃদয়কেও সৃষ্টির তরঙ্গে উতরোল করে তোলে।
বর্ষাকাল বাঙালি জীবনে এক অনন্য অধ্যায়। এ সময়ের প্রতিটি ক্ষণ মানুষের আবেগী মনকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও কৃতজ্ঞতার অবিনাশী গীতময়তায় ভরিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ বলেন-‘ঋতুর মধ্যে বর্ষাকাল শুধু একমাত্র। তাহার জুড়ি নাই, গ্রীষ্মের সঙ্গে তাহার মিল হয় না, গ্রীষ্ম দরিদ্র, সে ধনী। শরতের সঙ্গেও তাহার মিল হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কেননা শরৎ তাহারই সমস্ত সম্পত্তি নিলাম করাইয়া নিজের নদী-নালা, মাঠ-ঘাটে বেনামী করিয়া রাখিয়াছে। সে ঋণী, সে কৃতঙ্গ নহে।’ বর্ষণের অমিত বেগ সুন্দরের আলপনা মেলে ধরে পৃথিবীতে। এ ঋতু কূল–প্লাবী প্রণয়ের ব্যাকুল অভিযোজনা একেবারে আলাদা ও অন্যান্য। আষাঢ়ের মেঘলা আকাশের একটানা বৃষ্টির কানাড়ি রাগের মূর্ছনা মানব-মনকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। এবং একইসঙ্গে তাকে সৃষ্টির অভিলাষ করে দেয় চঞ্চল। রবীন্দ্রনাথ তাই বর্ষাকে কবিদের ঋতু বলেছেন। বর্ষার মেঘ-মেদুর দিবসের আলো-ছায়ালোকের সজল মেঘের শ্যামল কান্তি অতুল সৌন্দর্যে মহিমান্বিত।
বর্ষায় ঘন কালো মেঘে আকাশজুড়ে মেঘের অলকানন্দা। শীতল পবনের সঞ্চরণে ভেজা মাটি আর পাতার বুকে টুপটাপ শব্দের নিখুঁত যুগলবন্দির অবারিত পতনের শৈল্পিক নাম বর্ষণ। জলধারা পড়ার সময় আকাশের বর্ণিল ক্যানভাসে চলে মেঘ-রুদ্র আর বৃষ্টির ভাঙা-গড়া খেলা। আলো-তাপের মাঝে মেঘের ঘনঘটা আর ঝুম বৃষ্টির কলতানের মোহিনী রূপ বাংলার প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের মেলা বসায়। যার রূপবৈচিত্র্য দোলা দেয় কবি চেতনায়। গ্রীষ্মের খরায় প্রকৃতি শুষ্ক, রুক্ষ ও বিবর্ণ আবেশে জীবন অসহনীয় হলে, ঋতুরানি বর্ষার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে। স্নিগ্ধ সজীব আর লাবণ্যময় বর্ষার প্রভাবে প্রকৃতি প্রাণ-চঞ্চল প্রবাহে কবিমন ভেতর থেকে আনন্দে গেয়ে যায়-‘সজল ঘন বাদল বরিষণে, বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো এ জীবনে, এসো হে গিরি চুমি ছায়ায় ঘেরা কানন ভূমি, জীবন ছেয়ে এসো তুমি গভীর গর্জনে।’
বাংলা সাহিত্যে বর্ষাকাল তার রূপ ও গন্ধ দিয়ে চিরকালীন আবেদন সৃষ্টি করেছে কবি কল্পনায়। বর্ষার মেঘ, বৃষ্টি, কাদামাটি, জোসনা, বজ ধ্বনি এবং নদীর উথাল-পাথাল ঢেউ কাব্যিক ভাষায় রূপ পেয়েছে সাহিত্যিক ভাবনায়। প্রকৃতির এ উপকরণ কখনো কখনো প্রেম, বিরহ, দার্শনিকতা, আত্মদর্শন কিংবা বিপ্লবের প্রতীক হয়ে প্রাণবন্ত হয়েছে সৃষ্টিশীলদের কর রেখায়। প্রকৃতি ও মানব হৃদয়ের গভীর ও অতল স্পর্কের দিকটি প্রথম উন্মোচন করেন কবি কালিদাস। ‘বর্ষার সঙ্গে নরনারী বিরহ বেদনার নিগূঢ় সম্পর্কের বিষয়টি কাব্যজগতেই তিনি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন।’ অবশ্য ভারতীয় সাহিত্যে বর্ষার সঙ্গে বিরহের সম্পর্ক কালিদাসের মেঘদূতের আগে বাল্মীকির রামায়ণে দেখা যায়। তিনি তার অনুভাবনায় বর্ষার বাহ্যিক রূপকেই সেখানে চিত্রিত করেছেন। যেখানে বিরামহীন বর্ষণের বেগ, ধ্বনি, বজ্রপাত পশুপাখির আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং আকাশ-ধরণীর আবিলতা প্রতিস্থাপিত। বর্ষার সঙ্গে মানব হৃদয়ের গভীর সম্পর্ক তথা নর-নারী হৃদয়ের বিরহ-বেদনার আর্তনাদ সেখানে বিচ্ছিন্ন, অপরিমিত ও স্থূলভাবে শিল্পিত হয়েছে।
অন্যদিকে মেঘদূত কাব্যে বর্ষা শুধু ঋতু নয়, ঋতু পুরুষ। মেঘ দর্শনে গৃহে অন্তরায় যে প্রেমিকা তার পক্ষে প্রিয়জনের কথা মনে আসে, তাই মেঘদূতের পূর্বমেঘে মহাকবি কালিদাস বলেছেন, ‘তোমাকে বাতাসে ভর করে আকাশে উড়তে দেখলে প্রোষিতভর্তৃকা নারীরা তাদের স্বামীদের ঘরে ফেরার ব্যাপারে আশ্বস্ত হবে এবং তাদের এলো চুলের প্রান্তভাগ ওপরে তুলে তোমাকে দেখবে।’ (১১৯) বাংলা সাহিত্যে বর্ষার বৈচিত্র্যময় জগৎটি প্রাচীন যুগে চর্যাপদের কবিদেরও দৃষ্টি এড়ায়নি। মেঘ-মেদুর দিনের ছন্দিত শিহরণ কবিদের কাব্যিক ভাষা দিতে প্ররোচিত করেছে। সাধক এ চর্যাগীত নির্মাতাদের মনে মেঘ-বৃষ্টির গর্জন তাদের আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশে প্রেরণা জুগিয়েছে। কবি লিখেছেন-‘চারি কুণ্ডলি বজ্রঘনা গগনে গরজে মেঘ’ (লুইপা) অর্থাৎ কবি গগনের মেঘ গর্জনের মধ্যদিয়ে সাধনার দ্বন্দ্ব, অস্থিরতা ও আত্মবীক্ষণ মিশে যাওয়ার পথ পেয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যে বর্ষার বিচিত্র অনুভূতির জগতের রূপকে মানবীয় প্রকরণে দেখা যায় বৈষ্ণব কবিদের পদাবলীতে। এক্ষেত্রে বৈষ্ণব কবিরা কালিদাসের প্রভাবে নিজেদের আবেশিত করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানব মনের যে অভিন্ন সঞ্চরণ তা স্পর্শকাতর করে রেখায়িত হয়েছে এ সময়ের কবিদের পদাবলীতে। বিশেষত রাধাকৃষ্ণের বিরহ মিলনের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতির উচ্ছ্বাস, বর্ষার চিত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী করে কবিরা চিত্রিরূপ দিয়েছেন। বর্ষায় কৃষ্ণ রাধাকে পৌঁছে দেওয়ার অনুভূতি নিয়ে জয়দেব তার কাব্যে উল্লেখ করেন, ‘মেঘে আকাশ অন্ধকার, আর তমালবৃক্ষে বনভূমিও শ্যামবর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বর্ষা মুখর সন্ধ্যার পথ চিনে চলা কঠিন।’ অন্যদিকে জ্ঞানদাস বর্ষার ভয়াবহতা নিয়ে ভীরু মনে রাধার অভিসারের কথা প্রসঙ্গে জানান-‘মেঘ যামিনী অতি ঘন আন্ধিয়ার। ঐছে সময়ে ধনি করু অভিসার। ঝলকত দামিনী দশ দিক আপি। নীল বসনে ধনি সব তনু ঝাঁপি।’
কবি জ্ঞানদাস বর্ষাকে বিরহের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, ‘রজনী শ্যাম ঘন ঘন দেয় গরজন, রিমঝিম শব্দে বরিষে।’ কবি গোবিন্দ দাস তার পদাবলীতে প্রিয়ার অভিসারের পথে বর্ষার দুর্যোগকে অনিবার্য অনুষঙ্গ করে রেখায়িত করেছেন-‘বারি কি বারই নীল অভিসার, হরিবহ মানস-সুরধনি পার। ঘন ঘন ঝন ঝন বজন-নিপাত, শুনইতে শ্রবণে মরম জরি যাত।’ আবার কবি রায়শেখর তার পদাবলীতে উল্লেখ করেন, ‘গগনে অব ঘন মেহ দারুণ, সঘনে দামিনী চমকই, কুশিল পাতন শবদ ঝন ঝন, পবন খরতর বলগই, সজনি আজু দুরদিন ভেল।’ বর্ষা শুধু অপরূপ দৃশ্যের সমাগম নয়, এখানে সুখ-দুঃখ ও বিষাদ প্রবলভাবে সক্রিয়। কবি বিদ্যাপতি বিরহী রাধার চোখে অবিরল বর্ষণকে শৈল্পিক মাধুর্যের প্রতিপাদিত করেছেন। রাধিকা তার বিরহ বুঝাতে কাতরভাবে জানায়-‘অবধি সমাপল মাস আষাঢ়। অবে দিনে দিনে এ জীবন গাঢ় ভেল।’ আবার অনত্র ‘ভাদর মাস বরিষ ঘন ঘোর, সভদিস কুহুকও দাদুল মোর।’
চণ্ডীদাসের পদাবলীতে বর্ষা বিরহের আঁধারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভাবমূল্যে তা অতুলনীয়। ‘বর্ষা শুধু বজ্রবিদ্যুতে নায়িকাকে আর্ত করিতেছে না; অধিকন্তু একটি নিগূঢ়ও অপরিমেয় বেদনার মধ্যে তাহাকে নিমজ্জিত করিতেছে।’ বর্ষার রসে সিক্ত কবি তার পদে উল্লেখ করেন-‘এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা, কেমনে আইলো বাটে। আঙ্গিনার মাঝে বঁধুয়া ভিজেছে দেখিয়া পরান ফাটে।’ ব্যাকুল বিরহিনি চিত্তে আরেক জায়গায় রাধিকা বলেন-এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর, এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর।’ বড়ুচণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে বর্ষা এলে রাধার যন্ত্রণা বেড়ে যায়। বংশীখণ্ডে আমরা দেখি বিরহী ব্যাকুল রাধা বড়াইকে বলেছে-‘আষাঢ় শ্রাবণ মাসে মেঘ বরিষে যেহ্ন ঝর এ নয়নের পানি, আল বড়ায়ি, সংপুটে প্রণাম করি বুইলোঁ সখিজনে কেহো নান্দে কাহ্নাঞিঁকে আনি।’
বর্ষার বাস্তব রূপ দেখতে পাই ষোড়শ শতকের জীবনবাদী কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরা বারোমাসি দুঃখ কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে বর্ষার বহিরঙ্গকে তীব্রভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘আষাঢ়ে পূরিল মহী নব মেঘ জল। বড় বড় গৃহস্থের টুটয়ে সম্বল। শ্রাবণে বরিষে মেঘ দিবস রজনী, সিতাসিত দুই পক্ষ একই না জানি।’ মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য ধারণা থেকে বর্ষাকে এনেছেন প্রকৃতির প্রচণ্ড শক্তিরূপে। তার ‘বর্ষাকাল’ কবিতায় আমরা যজ্ঞের বিরহী মনকে দেখতে পাই, যা গভীর গর্জনে উত্তাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে। ‘গভীর গর্জন সদা করে জলধর, উত্থলিল নদ-নদী ধরণীর উপর।’ আধুনিক সময়ের কবি অক্ষয় কুমার বড়াল তার ‘কাব্যগ্রন্থের ‘শ্রাবণ’ কবিতায় বৃষ্টিকে অনুপম ভাবনায় গ্রন্থণ করেছেন-‘সারাদিন একখানি জলভরা শ্রান্ত মেঘ, রহিয়াছে ঢাকিয়া আকাশ।’
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রকৃতি সচেতন কবি বর্ষা তার কবিতায় অন্য এক মাত্রা বয়ে এনেছে। শুভ্র পলি মনের আবেগে ভেসে বর্ষা তার কররেখায় ‘মোহনীর ওড়না’ উড়িয়ে আসে পুব হাওয়ায়। বিখ্যাত কবিতা ‘তখন ও এখন’ ধারণ করে আছে মায়াভরা সেই শিহরিত নিবেদন-‘তখন শুধু ভরিছে গগন নূতন মেঘে, কদম-কোরক দুলিছে বাদল বাতাস লেগে।’ আবার অন্যত্র বলেছেন, ‘মেঘ.লা. থম.থম, সূর.য.ইন.দু, ডুব.ল. বাদ.লায়. দুল.ল সিন.দু।’ বর্ষার মায়াবী শক্তির অবিচ্ছিন্ন মায়াবী টান হৃদয়ে শ্রেয়সীর অনুপুস্থিতি হৃদয়কে বিহবল করে দেয়। বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবিতায় সেদিকটি কমল হয়ে ফুটে উঠেছে এমনিভাবে-‘বর্ষা ঝরা এমনি প্রাতে আমার মত কি, ঝুরবে তুমি একলা মনে বনের কেতকী? মনের বনে নিশীথ রাতে, স্বপ্ন দেখে উঠবে জেগে, ভাববে কত কি! মেঘের সাথে কাঁদবে তুমি, আমার চাতকী।’ সিন্ধু হিন্দোর কাব্যগ্রন্থের ‘অনামিকা’ কবিতায় বলেছেন-‘আষাঢ় মেঘে রাখল ঢাকি, নাম যে তোমার কাজল আঁখি, শ্রাবণ বলে, জুই বেলা কি? কেকা বলে মালবিকা।’ আবার ‘সন্ধ্যা’ কাব্যের ‘তর্পণ’ কবিতাটির মধ্যেও আমরা বাদল দিনের স্বরূপকে প্রত্যক্ষ করি। ‘আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে ভারত ভাগ্য ভরি। আকাশ ভাঙিয়া তেমনি বাদল ঝরে সারা দিনমান।’
নগর জীবনের বিকার, নৈরাশ্য, হতাশা, বিক্ষোভ ও স্খলনকে জীবন চেতনার গভীরে প্রবেশ করে মনকে অস্থির করেছেন কবি সমর সেন। তার কাব্যে আমরা বর্ষার বিমূর্ত ছবিকে শব্দের শক্তিতে মূর্তমান হতে দেখি। বিবর্ণ সময়ের কাছে বুকের মাঝে দীর্ঘস্বাস জেগে থাকলেও তিনি তাকে অতিক্রম করার অঙ্গীকারে বলে ওঠেন, ‘চারিদিকে আকাশ মেঘ-মদির, আর কিসের দীর্ঘশ্বাস।’ কবি বিষ্ণু দে মনে করেন বর্ষা প্রকৃতির তরল পদার্থের কোন জলীয় দ্রব্য নয়। বর্ষা সাংস্কৃতিক পরিভাষা পুষ্ট হয়ে মননের গহনে ভেজা মাটির-গন্ধে আনন্দের হিল্লোল তোলে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নতুন বুর্জোয়া স্বভাব মানুষকে যে ঐতিহ্যশালী জাতিসত্তা থেকে ঘরছাড়া করার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়েছে, তা যথার্থ অনুধাবন করেন কবি বিষ্ণু দে। একাকিত্বের মাঝে তাই স্বদেশ ভাবনা ক্ষমতার দুর্নীতিগ্রস্ত মানব সমাজ ছেড়ে দিতে গিয়ে বলতে পারেন-‘পালায় সে মেঘে মেঘে বজ্রে ও বিদ্যুতে, মোহনার ভাটায় ভাটায়, আষাঢ়ের অশ্রুহীন হঠাৎ সন্তাপে রেখে যায় শুধু হাওয়া শুধু রেশ আকাঙ্ক্ষায় আকাঙ্ক্ষায়।’ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বাংলার ষড়ঋতুর বর্ণিল বিকাশকে বিস্মায়িত করেছেন শিল্পকৌশল ও দার্শনিক ভাবনায়। ‘শ্রাবণবন্যা’ কবিতাটি তার শিল্প সফল রূপায়ণ। সংকীর্ণ দিগন্তচক্র, অবলুপ্ত নিকট গগনে, পরিব্যাপ্ত পাংশূল সমতা; অবিশ্রান্ত অবিরল বক্র ধারা ঝরিছে সঘনে।’ জীবনানন্দ দাশ আমৃত্যু ছিলেন প্রকৃতিপ্রিয় কবি। সর্বক্ষণ স্নাত হয়েছেন হৈমন্তিক শিশির ও রূপসী বাংলার রূপ অবগাহন করে। তার একাধিক কবিতায় বন্দিত হয়েছে বর্ষা। ‘সমুদ্র চিল’ কবিতায় বৃষ্টির ফোঁটা নিয়ে উচ্চারণ করেন-‘যেমন বৃষ্টির পরে ছেঁড়া ছেঁড়া, কালো মেঘ এসে, আবার আকাশ ঢাকে মাঠে মাঠে অধীর বাতাস।’ অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় বর্ষা প্রেমের প্রতীক নয়, এসেছে নূতন প্রাণের সঞ্চারক হয়ে। হারাবার কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত দৃষ্টি কবিতায় বর্ষা প্রতিবিম্বিত হয়েছে নতুন মাত্রায়। অন্ধকার মধ্য দিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে, বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে দিগন্তপিয়াসী মাঠে, স্তব্ধ মাঠে, মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে, ঝরে বনতলে শিরায় শিরায় স্নানে, বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।’
জসীমউদ্দীন গ্রাম্য জীবনকে উপজীব্য করে শিল্পী মনের দরদে সুনিপুণভাবে বর্ষা চিত্র এঁকেছেন। তার ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতায় আষাঢ়ের প্রতিবেশ পেয়েছে ভিন্নমাত্রার ব্যঞ্জনা। ‘আজকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলট-মেঘের আড়ে, কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছলছল জল-ধারে।’ পরবর্তী পঙ্ক্তিতে আবেগ থরথর চিত্তে পিয়াসী মনের বাসনাকে গেঁথেছেন শব্দ মালায়। ‘হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি, নিরালা বাদল ভাসায়ে দিয়েছে নয়া জানি কোন দিঠি।’ আল মাহমুদের ‘প্রকৃতি’ কবিতায় বর্ষার মুগ্ধতাকে অনুভব করি ভিন্ন এক প্রেক্ষিতে। যেখানে বর্ষা নিরন্তর বয়ে চলা মানুষের লক্ষ্য এবং তার স্বরূপকে হৃদয়ের গভীর থেকে দেখার চেষ্টা অবলোকন করি। ‘কতদূর এগুলো মানুষ! কিন্তু আমি ঘোর লাগা বর্ষণের মাঝে আজও উবু হয়ে আছি।’
বর্ষা রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে এসেছে খুব গভীরভাবে। ঋতু ভাগের ভিত্তিতে গীতবিতানের ১১৫টি গানে বর্ষার কথা আছে। মানসী কাব্যের বর্ষার দিনে কবিতায় রহস্যের দুয়ার খুলে বিরহী মনের একান্ত ভাবনাকে ভাব-তরঙ্গে দুলিয়েছেন কবি। ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়, এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝর ঝরে, তপনহীন তমসায়।’
আষাঢ়ের বন্দনায় রবীন্দ্রনাথ একক ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। যার কবিতায় বর্ষায় এসেছে সামগ্রিক রূপবিভঙ্গে-‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে, এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি, পুলকে দুলিয়া উঠেছে আবার বাজি, মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে, রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে, নব তৃর্ণদলে দলে বাদলের ছায়া পড়ে, এসেছে এসেছে এই কথা বলে প্রাণ, এসেছে এসেছে উঠিতেছে গান, নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।’ সময়ের সঙ্গে প্রকৃতির বদল হয়। এ পরিবর্তন ঋতু পরিবর্তনের জন্য। বাংলাদেশের মতো এমন বৈচিত্র্যময় ঋতু পরিবর্তন পৃথিবীর মধ্যে বিরল।
বাংলা কবিতায় বর্ষাকাল তাই শুধু ঋতু বা প্রকৃতির উপস্থাপন নয়। বরং একটি অনুভব, আত্মপ্রকাশ ও ঐতিহ্যবাহী ভাবজগৎ। যেখানে ধর্ম দার্শনিকতা ও মনন জড়িয়ে আছে গভীর থেকে গভীরতর হয়ে। প্রাচীন যুগে কাব্যের ভুবনে যেখানে বর্ষা এসেছে ঈশ্বর ও প্রেমিকার প্রতীক্ষা হিসাবে। আধুনিককালে তা হয়ে উঠেছে আত্মসচেতন ও অস্তিত্বের সংকটের রূপক। এক কথায় বাংলা সাহিত্যে বর্ষা চিরন্তন কাব্যিক সঙ্গী, নিঃসঙ্গতার ধ্বনি, জাগরণের বার্তা এবং নিঃশব্দ অভিমান।








