বান্দরবান জেলায় বন্যায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার মোট ৩৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একইসঙ্গে পাহাড় ধস ও বন্যায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লামা পৌর এলাকা, বান্দরবান পৌরসভা ও সদর উপজেলায়।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা ১১টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বান্দরবানে সাম্প্রতিক পাহাড় ধস ও বন্যার সার্বিক চিত্র তুলে ধরার সময় এ কথা বলেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সানিউল ফেরদৌস।
জেলা প্রশাসক জানান, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কমে ২ মিলিমিটারে নেমে এসেছে। অতিবৃষ্টির কারণে জেলার প্রধান দুই সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর পানি একসময় বিপৎসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ দশমিক ৪৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৩ দশমিক ৭১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, জেলায় মোট ৪৭টি ভূমিধস হয়েছে। যার মধ্যে ১১টি বড় আকারের। ভূমিধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনীর সহায়তায় এসব সড়ক পুনরায় চালু করা হয়েছে।
সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সওজের ৬১ কিলোমিটার, এলজিইডি ও স্থানীয় সড়ক প্রায় ৯০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ছোট-বড় ৪টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি সচল করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি তিনটির কাজ চলমান রয়েছে।
সানিউল ফেরদৌস বলেন, কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ৭টি উপজেলায় এ সব সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী ও ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া পৌরসভা থেকে প্রতিদিন দুই বেলা করে প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে, যা এখনো চলমান রয়েছে। নগদ ৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৩ হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রমে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং বিভিন্ন এনজিও বিশেষ করে ব্র্যাক, গ্রাউস, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও রেড ক্রিসেন্ট সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে যাওয়া পরিবারগুলোর জন্য অন্তত দুই দিনের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামতে ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিনের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে ৩ হাজার টাকা করে গৃহনির্মাণ অনুদান দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পৌরসভা প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক, জেলা পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, বান্দরবান সড়ক ও জনপদ (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও বান্দরবান জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেনসহ জেলার ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।








