সত্তরোর্ধ্ব নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর সবাই হতবাক। ঘরভর্তি আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ছত্রাক, ছোট খাটে পড়ে ছিল অর্ধগলিত দেহ। কবে মারা গেছেন কেউ জানে না, সন্তানরাও না। রান্নাঘর দেখে বোঝা যায় বছর ধরে চুলা জ্বলেনি। এই নোংরা পরিবেশই বলে দেয় কতটা অবহেলায় ছিলেন তিনি। বৃদ্ধার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। মায়ের সঙ্গে মেয়েই থাকতেন। সাড়া না পেয়ে মেয়ে ক্লিনিক থেকে নার্স ডাকেন, নার্সই পুলিশে খবর দেয়। সুস্থ মানুষ এমন পরিবেশে থাকতে পারেন না। মেয়ের মানসিক অসুস্থতা না থাকলে মায়ের লাশের গন্ধও তিনি টের পেতেন।বাংলাদেশে সাধারণত সন্তানই মা-বাবাকে দেখে। তবুও ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন হয়েছে। সেখানে সামর্থ্যবান সন্তানকে বাবা-মায়ের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ ও সেবা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আইন ভাঙলে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মুম্বাইয়ে আমেরিকা প্রবাসী ছেলেকে মা অনুরোধ করেছিলেন আমেরিকায় নিতে অথবা বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে। ছেলে সময় পায়নি। কোটি টাকার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় কঙ্কাল। আজ মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশের ভেতরেও স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করেন। ফলে মা-বাবা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। গৃহকর্মীর কাছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে যাওয়া সবসময় নিরাপদ নয়। সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে, বিছানায় প্রসাব করার অপরাধে গৃহকর্মী বৃদ্ধাকে চড় মারছে। তবু সমাজের ভয়ে আমরা ঘরেই রাখি, কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো পাপ মনে করি।অথচ বহু সন্তান চাইলেও দায়িত্ব নিতে পারে না। নিজের খাবার জোগাড় করতে না পেরে কেউ ছিনতাই করে, কেউ চুরি করে, কেউ দেহ বিক্রি করে। কখন জেলে যায় বা হাসপাতালে পড়ে থাকে মা-বাবাও জানেন না। দিনরাত খেটেও স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে না পারলে বৃদ্ধ মা-বাবার গুরুত্ব কমে যায়। অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী বা দুরারোগ্য সন্তান আছে, যারা আজীবন অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেসব পরিবারে শুধু মেয়ে, সেখানে বিবাহিত মেয়ের পক্ষে মা-বাবাকে সেবা দেয়া কঠিন। আবার অসংখ্য প্রবীণের সন্তান নেই, আত্মীয় নেই। সম্পদ না থাকলে ভাড়া করা লোক রাখাও সম্ভব নয়। এরাই রাস্তায় ভিক্ষা করে, স্টেশন বা ফুটপাতে ঘুমায়, পুলিশের লাঠি খায়। তাই সব মা-বাবা সন্তানের নির্যাতনে ঘর ছাড়েন, এই কথা সত্য নয়।দেশে এখনো দশ শতাংশ মানুষ চরম দরিদ্র। বসতি নেই, বস্ত্র নেই, চিকিৎসা নেই, খাবারের নিশ্চয়তা নেই। ত্রিশ শতাংশ মানুষের তিন বেলা ভাত জোটে না। অর্থনীতি যতই বাড়ক, সবাইকে কাজ দেয়া কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিতে এনে সহায়তা দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে রোজগারের আশায় সন্তানেরা বৃদ্ধ মা-বাবাকে ফেলে বিদেশে যাচ্ছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা শহরে এসে ফুটপাতে কচু, লতি, পিঠা বিক্রি করছে। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর কাছ থেকেও পুলিশ আর মাস্তান চাঁদা নেয়। রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায়, রোগে কাতর বা স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ফুটপাতে পড়ে আছে। ফেইসবুকে পোস্ট দেয়া পথিকেরা তাদের ডিঙিয়ে চলে যায়। জীবিত না মৃত, খোঁজ নেয়ার তাগিদও থাকে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। পুলিশ আর দারোয়ানের গুঁতা খাওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ফুটপাতের চেয়ে বৃদ্ধাশ্রম স্বর্গ।নিঃস্ব বিধবা, নিঃসন্তান, বিপত্নীক বা অকৃতদার প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমই উত্তম জায়গা। দেশের অধিকাংশ বৃদ্ধাশ্রম দুস্থ ও অসহায় প্রবীণের বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার স্থান। সহায়-সম্বলহীন বয়োবৃদ্ধদের নিশ্চিত জীবনযাপনের একমাত্র আশ্রয় এটিই। মূল্যবোধ বদলাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রমে রাখা মানেই মা-বাবাকে ফেলে দেয়া নয়। প্রয়োজনের কাছে ধর্মের বাণীও অশ্রুত থাকছে। অভাবের তাড়নায় প্রবীণদের শ্রদ্ধা করার তাগিদও কাজে আসছে না।এখন ভালো বৃদ্ধাশ্রমকে কমিউনিটি লিভিং প্লেস বলা যায়। এখানে সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, ভাব বিনিময় হয়, যা অনেক সময় পরিবারেও মেলে না। চার হাজার বছর আগে চীনে অসহায় প্রবীণদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই প্রয়োজন আজও ফুরায়নি, বরং বেড়েছে। পাশ্চাত্যে সাবালক সন্তানেরা আলাদা থাকে, মা-বাবাও তাদের জীবনে বাধা হতে চান না। অনেকে বৃদ্ধাশ্রমে নিজের জগৎ গড়ে নেন। সব বৃদ্ধাশ্রম বিনা খরচে নয়, কোথাও প্রচুর অর্থ লাগে। তবু মানুষ সঙ্গ পায়, গল্প করে, টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। প্রতি বছর দল বেঁধে দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়। নিজেরাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। সেলিব্রিটিরা উপহার নিয়ে আসেন। সন্তানেরাও দেখতে যায়। তাই উন্নত বিশ্বে প্রবীণ নিবাস আরামদায়ক। বৃদ্ধাশ্রম মানেই এতিমখানা নয়, এটি নিঃসঙ্গতা কাটানোর উত্তম স্থান।আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রমের প্রতি আতঙ্ক কমছে। অনেক বৃদ্ধাশ্রমে এখন নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বইপড়া, বিনোদন, ভ্রমণের সুবিধা আছে। ঘরে সন্তান বা আত্মীয়ের সান্নিধ্য না পেলে সমবয়সীদের সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাই শ্রেয়। পাশ্চাত্যে যারা বৃদ্ধাশ্রমে যান না তারা নিঃসঙ্গতা কাটাতে কুকুর-বিড়াল পোষেন। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র দেশ হওয়ায় প্রবীণদের সমস্যা ব্যাপক। সরকার বয়স্ক ভাতা চালু করলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি-বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যে পরিবারে সন্তানের সামর্থ্য নেই, সেসব মা-বাবার ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেয়া উচিত। নচিকেতার গান শুনে যারা কেঁদেছেন, সামর্থ্যবানদেরও বৃদ্ধাশ্রম গড়ার শপথ নেয়া দরকার।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]