জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেশ-বিদেশে আরও বিস্তৃতভাবে পরিচিত করে তুলতে পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা, প্রকাশনা এবং গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রসার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নজরুল–গবেষক, শিল্পী, কবি ও আবৃত্তিশিল্পীরা। তাঁদের মতে, বাস, ট্রেন, বিমান থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে নজরুলের গান ও সৃষ্টিকর্ম উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁর দর্শন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও ছড়িয়ে পড়বে।

রোববার জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে শিল্পী সম্মিলন ও মতবিনিময় সভায় এসব প্রস্তাব উঠে আসে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই মতবিনিময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা অংশ নেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জানিয়েছে, ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’ উপলক্ষে বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, জনমুখী এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রভাব সৃষ্টিকারী করে তুলতেই এই মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়।

আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক আয়োজন নয়, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও নজরুল প্রতিভা অন্বেষণ, কর্মশালা ও গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে বিদেশে ‘নজরুল কালচারাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে নজরুলচর্চা বাড়ানোর জরুরি। তাঁদের মতে, নজরুলচর্চা শুধু গান, কবিতা বা নৃত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। যন্ত্রসংগীত, সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শুদ্ধ বাণী ও সুরে নজরুলচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে নেওয়া কর্মসূচিগুলো যেন বছর শেষ হওয়ার পরও ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া নজরুলের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ ও গবেষণা জোরদার, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের বিস্তার, জনসমাগমস্থলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, নজরুল কালচারাল মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা এবং ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে একটি থিম সং তৈরির প্রস্তাবও দেন বক্তারা। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি উদীয়মান শিল্পীদেরও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মতামত শোনেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদক, মৌলবাদ ও উগ্রবাদমুক্ত সমাজ গঠনে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন প্রজন্মকে লালন, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালিসহ বাংলা সংস্কৃতির ধারার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে কাজী নজরুল ইসলামের গান, কবিতা ও লেখা আরও অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।

সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) আহ্বায়ক হেলাল খান। সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন জানান, ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সেসব কর্মসূচি কীভাবে আরও বিস্তৃত পরিসরে, সবার অংশগ্রহণে এবং জনমুখীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে লক্ষ্যেই এই মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।সম্মিলনে দেশের বিভিন্ন মাধ্যমের প্রায় চার শ কণ্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী ও নজরুল–গবেষক অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে বক্তব্য দেন লুবনা মারিয়াম, ফেরদৌস আরা, খায়রুল আনাম শাকিল, কল্পনা আনাম, সাদিয়া আফরীন মল্লিক, ফাতেমা তুজ জোহরা, অধ্যাপক নাশিদ কামাল, ইয়াকুব আলী খান, গাজী আব্দুল হাকিম, সুজিত মোস্তফা, সীমা ইসলাম, এ এফ এম হায়াত উল্লাহ, সাজু আহমেদ, প্রিয়াংকা গোপ প্রমুখ।