প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা। বুধবার (১৫ জুলাই) নিজেকে বেলুচিস্তানের প্রতিনিধি দাবি করা মীর ইয়ার বালোচ নামে এক ব্যক্তির এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে ঘোষণা করা হয় যে, পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তান ভেঙে আলাদা হয়ে গেছে ও নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই পোস্টে দাবি করা হয়, রিপাবলিক অব বেলুচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী এরই মধ্যে বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। তিনি আরও জানান, বেলুচিস্তান তার নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘মা চুকাইন বালোচানি’ (Ma Chukain Balochani) গ্রহণ করেছে, নতুন জাতীয় পতাকা উন্মোচন করেছে ও নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ‘বালোচি ফালুস’ (Balochi Falus) চালু করেছে।

পোস্টটিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বেলুচিস্তানের স্বীকৃতির আবেদন জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, ভারতীয় নাগরিক, সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবার ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, তারা যেন বালোচদের ‘পাকিস্তানের নিজস্ব মানুষ’ হিসেবে সম্বোধন না করেন।

কী বলা হয়েছে সেই ভাইরাল চিঠিতে?

স্বঘোষিত প্রশাসনের পক্ষ থেকে জারি করা এই বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, নতুন প্রশাসন অঞ্চলটির সোনা ও তামার খনি, গ্যাস ক্ষেত্র ও কয়লা খনিসহ প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।

নথিটিতে আরও অভিযোগ করা হয় যে, পাকিস্তানের সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা পদত্যাগ করে বালোচ আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।

স্বাধীনতাকামীরা লিখেছেন, আজ আমরা আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে বেলুচিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। আমাদের হয়তো ফাইটার জেট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ভারী কামান নেই, কিন্তু মাটির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীকে উৎখাত করতে বেলুচিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের ৫ লাখ সদস্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

তারা ভারতীয়দের উদ্দেশে আরও বলেন, আমরা পাকিস্তানি নই, আমরা বেলুচিস্তানি। পাকিস্তানের নিজস্ব মানুষ হলো পাঞ্জাবিরা, যাদের কখনো বিমান হামলা, গুম ও গণহত্যার মুখোমুখি হতে হয়নি।

তবে এই দাবির সত্যতা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো যাচাই করা হয়নি।

 

ভারতের অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা

স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বেলুচিস্তান ভারতের কাছে কূটনৈতিক স্বীকৃতি চেয়েছে। অতীতে এই অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, বর্তমান পরিস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য বেশ জটিল।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই বিষয়ে নাক গলানো উচিত হবে না। কারণ বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দিলে তা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হবে। তাছাড়া এটি কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলবে।

এই স্বীকৃতি দিলে অনেকে তখন অভিযোগ করতে পারেন যে নয়াদিল্লি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এবং তারা বেলুচিস্তানকে কাশ্মীরের সাথে তুলনা করতে শুরু করবেন, যা ভারতের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করবে।

অ্যাসসেন্ডিয়া স্ট্র্যাটেজিস-এর ম্যানেজিং পার্টনার ও বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি জানান, ভারত কোনো হস্তক্ষেপ করলে পাকিস্তান আবারও কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে কোণঠাসা করার সুযোগ পাবে।

নয়াদিল্লির জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়া। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত ও চীন মাত্র কিছুদিন আগেই তাদের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করতে পেরেছে। বেলুচিস্তানকে সমর্থন করলে এই সম্পর্ক আবার আগের চেয়েও খারাপ হতে পারে এবং এটি চীন ও পাকিস্তানকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে, যা ভারতের সামরিক বাহিনীর জন্য এক বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ।

এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইরান এরই মধ্যে বালোচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যে কোনো ধরনের বাহ্যিক সহায়তার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বর্তমান আঞ্চলিক সমীকরণ ও চাবাহার বন্দরের মতো বাণিজ্য উদ্যোগের স্বার্থে তেহরানকে চটানো ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়।

নিউজ১৮-এর সঙ্গে আলাপকালে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করলে তা পুরো অঞ্চলে  অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। অঞ্চলটি এমনিতেই বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদে জর্জরিত, তাই ভারত কোনোভাবেই উত্তেজনা বাড়াতে বা সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিতে চাইবে না। আপাতত এই পরিস্থিতিতে ভারতের নীতি হলো ‘ধৈর্য ধরো ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করো’।

বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বেলুচিস্তান আয়তনের দিক থেকে দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ। তবে এখানে দেশের মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন। ইরান ও তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সঙ্গে এর অস্থিতিশীল সীমান্ত রয়েছে ও আরব সাগর বরাবর রয়েছে বিস্তীর্ণ উপকূলরেখা।

বালোচ উপজাতির নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে, যারা বহু শতাব্দী ধরে এখানে বসবাস করছেন। বালোচদের পর এখানে দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী হলো পশতুন।

১৯৪৮ সালে কালাত রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে পাকিস্তান এই অঞ্চলটি দখল করার পর থেকেই এখানে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। বালোচদের অভিযোগ, একের পর এক কেন্দ্রীয় সরকার তাদের প্রান্তিক করে রেখেছে। ফলে অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক বর্জন ও সামরিক নির্যাতনের কারণে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছে।

সোনা, হীরা, রুপা ও তামায় সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের লভ্যাংশের ন্যায্য অংশ এখানকার মানুষ পায় না ও তারা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

বিদ্রোহের আরেকটি বড় কারণ হলো চীনের অর্থায়নে পরিচালিত বহু বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (CPEC)। এটি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ।

ওমান উপসাগরের কাছে গদর (Gwadar) শহরের গভীর সমুদ্র বন্দরটিকে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন সেখানে খনি প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সঙ্গেও জড়িত। স্থানীয়দের মতে, এটি বেইজিং কর্তৃক তাদের সম্পদ ও জমি শোষণের শামিল। তারা আশঙ্কা করছেন, চীনা বিনিয়োগ ও শ্রমিকদের আগমনের ফলে বালোচ জনগণ আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট, নিউজ ১৮ 

এসএএইচ