প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরা ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশের সহজ উপায়। একটি আন্তরিক আলিঙ্গন মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে, কাছের মানুষের সঙ্গে তৈরি করতে পারে আবেগের সংযোগ। কিন্তু সেই পরিচিত আলিঙ্গনই যদি গুরুতর শারীরিক আঘাতের কারণ হয়, তাহলে অবাক হওয়ারই কথা।
সম্প্রতি চীনের এক দম্পতির সঙ্গে ঘটে যাওয়া এমনই একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বামীর আলিঙ্গনের পর স্ত্রীর পাঁচটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়, আরেকটিতে দেখা যায় সূক্ষ্ম ফাটল। চিকিৎসকেরা এর পেছনে গুরুতর অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি ব্যতিক্রমী হলেও এটি মনে করিয়ে দেয়, শরীরের ভেতরে হাড়ের দুর্বলতা তৈরি হলেও অনেক সময় তা সহজে বোঝা যায় না।
কী ঘটেছিল চীনের ওই দম্পতির সঙ্গে?
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের জিয়াংসু প্রদেশের বাসিন্দা ওয়াং নামের এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে ঠান্ডা লাগার কথা শুনে জড়িয়ে ধরেন। স্ত্রীকে উষ্ণতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা সেই আলিঙ্গনের পরই তিনি তীব্র ব্যথা অনুভব করেন এবং মাটিতে বসে পড়েন। ব্যথার কারণে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রথমে আঘাতটিকে তেমন গুরুতর মনে না হলেও পরদিন হাসপাতালে গিয়ে বুকের সিটি স্ক্যান করানোর পর ধরা পড়ে, তাঁর পাঁচটি পাঁজরের হাড় ভেঙেছে এবং আরেকটিতে সূক্ষ্ম ফাটল রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর হাড় গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই নারীর ওজন ছিল ৪৫ থেকে ৫০ কেজি। তিনি নিয়মিত কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ করতেন, প্রায়ই রাতের খাবার বাদ দিতেন, প্রতিদিন কফি পান করতেন এবং খুব কম সময় বাইরে কাটাতেন। চিকিৎসার পর তাঁকে অস্ত্রোপচার ছাড়াই বিশ্রাম ও ওষুধের মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে এসব অভ্যাসের কোনটি তাঁর হাড়ের দুর্বলতার জন্য কতটা দায়ী, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো বিস্তারিত চিকিৎসা-তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই ঘটনাটিকে শুধু খাদ্যাভ্যাস কিংবা কফি পানের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আলিঙ্গনে কীভাবে ভাঙতে পারে পাঁজরের হাড়?
সুস্থ ও স্বাভাবিক শক্তির হাড়ে সাধারণ আলিঙ্গনের কারণে একাধিক পাঁজর ভেঙে যাওয়া অত্যন্ত বিরল। তবে হাড়ের গঠন দুর্বল হয়ে গেলে তুলনামূলক কম চাপেও ফাটল বা ভাঙন দেখা দিতে পারে।
পাঁজরের হাড় বুকের খাঁচা তৈরি করে, যা হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে সুরক্ষা দেয়। হাড়ের ঘনত্ব ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো দুর্বল হয়ে গেলে চাপ সহ্য করার ক্ষমতাও কমে যায়।

খুব শক্ত করে কাউকে জড়িয়ে ধরা, হঠাৎ নিজের দিকে টেনে নেওয়া কিংবা আলিঙ্গনের সময় শরীর তুলে ফেললে বুকের খাঁচায় চাপ পড়তে পারে। হাড়ের সহনক্ষমতা কম থাকলে এ ধরনের চাপেও আঘাত লাগার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, অস্টিওপোরোসিসের কারণে হাড় এতটাই ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে যে সামান্য আঘাতেও ভাঙন দেখা দেয়। পাঁজরের হাড়েও এ ধরনের ভাঙন হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস: হাড়ের নীরব ক্ষয়
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় সহজে ভেঙে যেতে পারে। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। তাই অনেকেই হাড় ভাঙার পর জানতে পারেন যে তাঁদের অস্টিওপোরোসিস রয়েছে।
ভাত বাদ নয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করতে পারেন জাপানিদের ১২ অভ্যাসবয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। তবে অল্প বয়সেও কিছু রোগ, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের প্রভাবে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এমন কয়েকটি বিষয় হলো:
• ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির ঘাটতি: হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে এই দুই পুষ্টি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ।
• অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ: দীর্ঘদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া এবং প্রোটিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
• কম ওজন: স্বাভাবিকের তুলনায় কম ওজন হাড় ক্ষয় ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
• শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করা ও চলাফেরা কমে যাওয়া হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
• হরমোনের পরিবর্তন ও কিছু ওষুধ: মেনোপজ ছাড়াও নির্দিষ্ট হরমোনজনিত সমস্যা এবং দীর্ঘদিন কিছু ওষুধ সেবনে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে।
পারিবারিক ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু কম ওজন, কফি পান কিংবা রোদে কম থাকার তথ্য দিয়ে কারও অস্টিওপোরোসিসের কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
হাড় দুর্বল হওয়ার লক্ষণ কী?
অস্টিওপোরোসিসকে প্রায়ই নীরব রোগ বলা হয়। কারণ, হাড়ের ঘনত্ব কমতে থাকলেও শুরুতে ব্যথা বা অন্য কোনো স্পষ্ট উপসর্গ না–ও দেখা দিতে পারে।

কিছু লক্ষণ হাড়ের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে। যেমন: সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া, মেরুদণ্ডের হাড়ে ভাঙনের কারণে উচ্চতা কমে যাওয়া কিংবা শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া। তবে এসব লক্ষণ না থাকলেও অস্টিওপোরোসিস থাকতে পারে।
ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসক হাড়ের ঘনত্ব পরিমাপের জন্য ডুয়াল-এনার্জি এক্স-রে অ্যাবজরপশিওমেট্রি বা ডিএক্সএ পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এই পরীক্ষায় হাড়ের খনিজ ঘনত্ব পরিমাপ করা হয়। বয়স, পূর্ববর্তী হাড় ভাঙার ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস, হরমোনজনিত অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে পরীক্ষার প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষ করে সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে গেলে শুধু ভাঙনের চিকিৎসা করেই থেমে থাকা উচিত নয়। এর পেছনে হাড়ের দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো জরুরি।
হাড়ের যত্নে খাবার ও জীবনযাপন
হাড় ভালো রাখতে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করতে হবে।
ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার: দুধ, দই, কাঁটাসহ খাওয়া যায়, এমন ছোট মাছ এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার হাড়ের স্বাস্থ্যে সহায়ক। বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ভিটামিন ডি: এই ভিটামিন শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। সূর্যালোকের সংস্পর্শে ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। পাশাপাশি কিছু খাবার থেকেও এটি পাওয়া যায়। তবে শুধু রোদে থাকলেই সবার চাহিদা পূরণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও সম্পূরক গ্রহণ করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত প্রোটিন: ডিম, মাছ, দুধ, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের পেশি ও হাড়ের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ কিংবা দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলা ভালো।
নিয়মিত ব্যায়াম: হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এবং ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী ভার বহনকারী ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্যে সহায়তা করতে পারে। শক্তিবর্ধক ব্যায়াম পেশির শক্তি ও ভারসাম্য উন্নত করতেও সাহায্য করে। তবে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাঁদের হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ব্যায়ামের ধরন চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।
হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় ধূমপান এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরা ঝুঁকিপূর্ণ?

একেবারেই নয়। এই ঘটনা থেকে স্বাভাবিক আলিঙ্গনকে বিপজ্জনক মনে করার কারণ নেই। সুস্থ মানুষের জন্য কোমল ও স্বাভাবিক আলিঙ্গন সাধারণত নিরাপদ।
তবে বয়স্ক ব্যক্তি, অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত মানুষ কিংবা হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেশি এমন কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ জোরে জড়িয়ে ধরা, শরীর তুলে ফেলা বা বুকের খাঁচায় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। আলিঙ্গনের সময় অপর ব্যক্তির স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
রসুন কি অ্যালিসিন ছাড়াই খাচ্ছেন? জেনে নিন সঠিকভাবে খাওয়ার উপায়আলিঙ্গন বা সামান্য আঘাতের পর তীব্র বুকব্যথা, শ্বাস নিতে কষ্ট কিংবা কাশি ও নড়াচড়ার সময় ব্যথা বাড়লে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। পাঁজরের হাড় ভাঙলে কখনো কখনো ফুসফুসের মতো অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ ধরনের উপসর্গকে সাধারণ পেশির টান ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ভালোবাসার সঙ্গে থাকুক শরীরের যত্নও

চীনের এই অস্বাভাবিক ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শরীরের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। একটি আলিঙ্গনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়াও জরুরি।
হাড়ের যত্ন মানে শুধু ক্যালসিয়াম খাওয়া নয়। প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে সচেতনতা। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ভালোবাসা প্রকাশে জোরের প্রয়োজন নেই। আর সুস্থ থাকতে প্রয়োজন শরীরের সংকেত বোঝা, নিজের যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ)।
ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম








