ভারতের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার ও বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর—দুটি প্রতিষ্ঠানই চলতি বছরের শেষ নাগাদ শেয়ারবাজারে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট ৭৩০ কোটি ডলারের এই দুটি আইপিও ভারতের পুঁজিবাজারে নতুন মাইলফলক হতে পারে।

ধনকুবের মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্সের ডিজিটাল শাখা জিও প্ল্যাটফর্ম ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ অব ইন্ডিয়া (এনএসই) গত মাসে কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) খসড়া নথি জমা দিয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডেরিভেটিভ এক্সচেঞ্জ এবং লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষ তিন ইকুইটি বাজারের একটি এনএসই ও জিওর এই তালিকাভুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুঙ্গে। কেননা এগুলো শুধু বড় অঙ্কের আইপিও নয়; গত এক দশকে ভারতীয়দের জীবনযাপন, ব্যয়, বিনিয়োগ ও লেনদেনের ধরনে যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, তার প্রতীকও এই দুই প্রতিষ্ঠান।

বাজারবিশ্লেষকদের ধারণা, জিও প্রায় ৪০০ কোটি ডলার তুলতে পারে। এতে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়াতে পারে ১২০ থেকে ১৬০ বিলিয়ন বা ১২ হাজার কোটি থেকে ১৬ হাজার কোটি ডলার। অন্যদিকে এনএসই তাদের ৬ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৫৭ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এমকে গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী যতীন সিং বিবিসিকে বলেন, এই দুটি ব্যবসা একেবারেই অনন্য। তাঁর ভাষায়, ভারতের পরিবারের সঞ্চয় যে মিউচুয়াল ফান্ড ও শেয়ারে স্থানান্তরিত হয়েছে, এনএসই হলো তার প্রতীক। অন্যদিকে জিও এককভাবে ভারতে ডিজিটাল বিপ্লব ঘটিয়েছে; এটি নতুন প্রজন্মের অনেক ব্যবসার ভিত্তি তৈরি করেছে।

২০১৬ সালে ভারতের জনাকীর্ণ টেলিকম বাজারে প্রবেশ করে জিও। তখন বাজারে ছিল ১৭টি অপারেটর। জিও প্রায় বিনা মূল্যে ডেটা দিয়ে ভয়াবহ মূল্যযুদ্ধ শুরু করে। ফলে খাতটি দ্রুত একীভূত হয়ে কার্যত দুই প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যায়।

এক দশক আগে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ২০ কোটি। এখন সেই সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি। এর মধ্যে শুধু জিওর গ্রাহকই ৫২ কোটি ৫০ লাখ। তারা এই ডেটা ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ, ওয়েব সিরিজ দেখা ও অনলাইন কেনাকাটা করছে।

এখন মোবাইল ডেটা ব্যবহারে ভারত বিশ্বে শীর্ষে—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জিওর সস্তা ইন্টারনেটই স্মার্টফোন ব্যবহারের গণতন্ত্রায়ণ ঘটিয়েছে।

একই সঙ্গে বদলে গেছে ভারতের অর্থ লেনদেনের ধরনও। ২০১৬ সালে চালু হওয়া ইউনিফায়েড পেমেন্ট ইন্টারফেস (ইউপিআই) প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২৮ বিলিয়ন বা ২২ হাজার ৮০০ কোটি ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন করেছে। একই সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন নেওয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয়দের মাসিক ডেটা খরচ নীরবে তিন গুণ হয়েছে, গ্রামীণ মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় যা তিন গুণ দ্রুত। ভিডিও দেখা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সময় বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যয়ও বেড়েছে।

অন্যদিকে এনএসইর উত্থান ভারতজুড়ে খুচরা বিনিয়োগে যে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার প্রতিচ্ছবি। মহামারির সময় লাখ লাখ ছোট বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসেন। সস্তা ডেটা ও স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রসারে অনলাইন ট্রেডিং হিসাব ৩ কোটি থেকে বেড়ে ২০ কোটির বেশি হয়েছে।

করপোরেট জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা এনএসইর তালিকাভুক্তি এখন ভারতের বাজার অবকাঠামোর পরিপক্বতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনএসই যখন ভিত্তি

ভারতের শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন ৪ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার, এর মূল ভিত্তি হলো এনএসই। বাজারমূল্যের দিক থেকে এটি এখন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম শেয়ারবাজার। প্ল্যাটফর্মের প্রতিটি লেনদেন থেকেই আয় করে প্রতিষ্ঠানটি, লেনদেনের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।

অন্যদিকে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির পাশাপাশি জিও নিজেকে শুধু টেলিকম কোম্পানি হিসেবে নয়, দেশীয় ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এ জন্য তারা এনভিডিয়া ও মেটা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। লক্ষ্য, ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা এবং ভারতীয় ভাষাভিত্তিক বড় ভাষা মডেল তৈরি।

বিশ্লেষকদের মতে, জিও এবং এনএসই সম্মিলিতভাবে ভারতের নতুন অর্থনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ। তাদের একসঙ্গে বাজারে আসা বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হতে পারে।

তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় আকারে ভারতীয় বাজারে ফিরবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। গত এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক খাতে ঝুঁকেছেন। ফলে ভারতীয় বাজার থেকে শত শত কোটি ডলার বেরিয়ে গেছে। রুপির দরপতনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এ ছাড়া গত কয়েক বছরে পেটিএম ও লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি অব ইন্ডিয়ার (এলআইসি) মতো আলোচিত আইপিওতে বিনিয়োগ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক ছোট বিনিয়োগকারী। অনেক বড় আইপিও এখন তালিকাভুক্তির চেয়ে কম দামে লেনদেন হচ্ছে।

এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই আইপিওগুলোর মূল্য নির্ধারণ থেকেই ঠিক হবে, ব্যবসায়িকভাবে সফল কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কতটা মুনাফাজনক হবে। অতিমূল্যায়িত করা হলে ভালো কোম্পানির শেয়ারও মানুষকে হতাশ করতে পারে।