ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৫৩৫ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ১৬ হাজার ৭৪০ জন আহত হয়েছে এবং ১৭ হাজার ৮৫৪ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার এসব তথ্য জানিয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেস।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সরকারি তথ্য অনুযায়ী—ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানী কারাকাস ও উপকূলীয় লা গুয়ারিয়া অঞ্চলের ৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত ১২ হাজার ৮০০ মানুষ অবস্থান করছেন। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

গতকাল সোমবার লা গুয়ারিয়ায় বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা ট্রাকে কফিন বহন করতে এবং ফরেনসিক কর্মীদের মরদেহ স্থানান্তর করতে দেখেছেন। একই সময়ে সাদা ক্রস দিয়ে চিহ্নিত একটি খোলা এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে পরিখা খুঁড়ে নিহতদের দাফনের কাজ চলছিল। ২৪ জুন কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প কারাকাস ও লা গুয়ারিয়ার আশপাশে আঘাত হানে।

এদিকে, দুর্যোগের পর ভেনেজুয়েলায় স্বাস্থ্যসংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ গাদাগাদি করে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। তাঁদের অনেকের কাছেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসাবিহীন আঘাত এবং সংক্রামক রোগে ভুগছেন। একই সঙ্গে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই পরিস্থিতির চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

কারাকাসের হোসে গ্রেগোরিও হার্নান্দেস হাসপাতালের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউহেনিও কোভা গত সপ্তাহে বলেন, ‘যে বিষয়টি আমরা সামনে দেখতে পাচ্ছি, তা হলো—দীর্ঘ সময় ধরে এই দুর্যোগের মধ্যে থাকা রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই জটিল ধরনের ট্রমার একটি পর্যায় অতিক্রম করেছি, যা এখনো চলবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে, কারণ এর সঙ্গে সংক্রমণও যুক্ত হচ্ছে।’

স্বাস্থ্যঝুঁকির লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে। লা গুয়ারিয়ার একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে গত সপ্তাহে আল জাজিরাকে দেওয়া প্রতিবেদনে সংবাদদাতা তেরেসা বো বলেন, ‘এখানকার মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া এবং অন্যান্য রোগের বহু খবর পাওয়া যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মানুষ বহনযোগ্য টয়লেটের দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পুনর্গঠনে সরকারের সহায়তা চাইছে, যাতে অতিরিক্ত ভিড় কমানো যায় এবং রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।’

সরকারের উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ নিজেরাই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

গবেষণা ও অধিকারভিত্তিক সংস্থা ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকারের (ডব্লিউওএলএ) সভাপতি ক্যারোলিনা হিমেনেস গত সপ্তাহে আল জাজিরাকে বলেন, ‘যেকোনো দেশের সরকারে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথম সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের হওয়া উচিত। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই সবচেয়ে শেষে সাড়া দিয়েছে।’

কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত কাতিয়া লা মারসহ কয়েকটি এলাকায় এখন পর্যন্ত সরকারি কর্তৃপক্ষ পৌঁছায়নি, অথবা যেখানে পৌঁছেছে সেখানেও তাদের সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। হিমেনেস বলেন, ‘উদ্ধার ও সহায়তার কাজ এসেছে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে, এসেছে নাগরিক সমাজ, মানবিক সহায়তাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে নয়।’