একসময় ভোলার খামারিদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার। এখান থেকেই স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছিল ছোট-বড় অসংখ্য খামার। অনেক বেকার যুবক-যুবতী পেয়েছিলেন আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এখন কার্যত অচল।

ভুক্তভোগী খামারিরা বলছেন, হ্যাচারির মেশিন ও জেনারেটর বিকল এবং প্রয়োজনীয় জনবল অভাব দেখিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন। এতে একদিকে নতুন উদ্যোক্তারা খামার গড়তে পারছেন না, অন্যদিকে পুরোনো খামারিরাও উচ্চমূল্যে নিম্নমানের বাচ্চা কিনে লোকসানের মুখে পড়ছেন।

আরও পড়ুন

বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ-কর অব্যাহতি চান পোল্ট্রি খাতের প্রান্তিক খামারিরা

সরেজমিনে ভোলা সদর উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারে গিয়ে দেখা যায়, একসময় যেখানে প্রতিদিন হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। হ্যাচারির বাচ্চা ফোটানোর দুটি মেশিন ও জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। হাঁস রাখার ছয়টি শেডের মধ্যে মাত্র দুটি শেডে প্রায় ৪০০টি হাঁস রয়েছে। বাকি শেডগুলো অযত্ন-অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

স্বপ্ন নিয়ে শুরু, থেমে গেল উৎপাদন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খামারিদের স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০১৩ সালে ভোলায় হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার নির্মাণ শুরু হয়। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো এখানে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন শুরু হয়।

আরও পড়ুন

হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে স্বাবলম্বী পুরো গ্রাম

কিন্তু পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। ২০১৯ সালের শেষদিকে প্রথমবার উৎপাদন বন্ধ হয়। পরে ২০২১ সালে সীমিত পরিসরে চালু হলেও ২০২৩ সাল থেকে আবারও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বাচ্চা উৎপাদন।

ভোলায় বন্ধ হাঁস প্রজনন খামার, ভাঙছে হাজারো উদ্যোক্তার স্বপ্ন

বাচ্চার সংকটে থমকে খামার, বাড়ছে লোকসান

ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ব্যাংকেরহাট এলাকার খামারি মো. ছালাউদ্দিন বলেন, বড় আকারের হাঁসের খামার করার পরিকল্পনা থাকলেও উন্নত জাতের বাচ্চা না পাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত দামের কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। সরকারি হাঁস প্রজনন খামার চালু থাকলে কম দামে বাচ্চা কিনে সহজেই খামার গড়ে তোলা যেত।

‘বড় আকারের হাঁসের খামার করার পরিকল্পনা থাকলেও উন্নত জাতের বাচ্চা না পাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত দামের কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। সরকারি হাঁস প্রজনন খামার চালু থাকলে কম দামে বাচ্চা কিনে সহজেই খামার গড়ে তোলা যেত’

একই এলাকার নুরুল ইসলাম বলেন, হাঁসের মাংস ও ডিমের ভালো বাজার থাকলেও বাচ্চার সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খামার করতে পারছেন না।

আরও পড়ুন

উৎপাদন খরচের চেয়ে কমছে ডিমের দাম, রাজশাহীতে বন্ধ হচ্ছে ছোট খামার

ভেলুমিয়া ইউনিয়নের খামারি মো. ইসমাইল হোসেন জানান, সরকারি খামার বন্ধ থাকায় গ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে বাচ্চা কিনতে হচ্ছে। কিন্তু ২০টি বাচ্চা কিনলে কয়েকদিনের মধ্যে ১৫-১৬টিই মারা যায়, ফলে লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তার সঙ্গে থাকা খামারি আবুল কাসেম বলেন, তিন বছর ধরে শুধু খামার চালুর আশ্বাসই শুনছেন, বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখেননি।

ভোলায় বন্ধ হাঁস প্রজনন খামার, ভাঙছে হাজারো উদ্যোক্তার স্বপ্ন

পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের খামারি মো. ইমরান হোসেন হাঁসের খামারের অবকাঠামো তৈরি করেও বাচ্চার অভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারেননি। তিনি বলেন, সরকারি খামার চালু থাকলে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় উন্নত জাতের বাচ্চা পাওয়া যেত, অথচ এখন বাজারে একটি বাচ্চার জন্য ৮০ থেকে ১০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। এতে নতুন খামার চালু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার মতে, এই খামার বন্ধ থাকায় ভোলার অনেক বেকার তরুণ-তরুণী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

হাঁসের খামার / দৈনিক ৬৫ হাজার টাকার ডিম বিক্রি করেন জাকির হোসেন

অন্যদিকে দক্ষিণ দিঘলদী গ্রামের খামারি মো. নুরুজ্জামান জানান, সরকারি খামার সচল থাকাকালে তিনি চরাঞ্চলে বড় পরিসরে হাঁস পালন করে ভালো লাভ করতেন। কিন্তু বর্তমানে উন্নত জাতের বাচ্চার সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে আগের মতো খামার পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না; এ অবস্থা চলতে থাকলে খামারই বন্ধ করে দিতে হবে।

অলস সময় কাটছে কর্মচারীদেরও

হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন বন্ধ থাকায় খামারটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কার্যত অলস সময় কাটাচ্ছেন। বর্তমানে খামারে আগের কিছু হাঁসের পরিচর্যা ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই তাদের।

‘হাঁসের মাংস ও ডিমের ভালো বাজার থাকলেও বাচ্চার সংকটের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খামার করতে পারছেন না’

আউটসোর্সিং কর্মচারী মো. সোহাগ হাওলাদার ও মো. রেদোয়ান হাসান বলেন, আগে খামারে সারাদিন বাচ্চা উৎপাদন, ডিম সংগ্রহ, মেশিন পরিচালনা ও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। এখন সেই ব্যস্ততা নেই। সারাদিন শুধু কয়েকশ হাঁসের খাবার দেওয়া ও দেখাশোনার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ।

ভোলায় বন্ধ হাঁস প্রজনন খামার, ভাঙছে হাজারো উদ্যোক্তার স্বপ্ন

আরও পড়ুন

পশুর হাট / চাঁপাইনবাবগঞ্জের গাড়লের চাহিদা তুঙ্গে, বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে

তারা বলেন, খামারটি আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, ভোলার হাজারো খামারিও স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা পেয়ে উপকৃত হবেন।

সংকটের মূল কারণ কী?

ভোলা হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীন মাহমুদ খামারটির স্থবিরতা ও নানা সংকটের চিত্র তুলে ধরে বলেন, আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি জেনারেটর এবং ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য দুটি আধুনিক মেশিন ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, গত প্রায় তিন বছর ধরে এ বাচ্চা ফোটানোর মেশিন ও জেনারেটর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

ভোলায় বন্ধ হাঁস প্রজনন খামার, ভাঙছে হাজারো উদ্যোক্তার স্বপ্ন

তিনি বলেন, শুধু যন্ত্রাংশই নয়, খামারটিতে তীব্র জনবল সংকটও রয়েছে। এখানে রাজস্ব খাতে ৫ জন এবং আউটসোর্সিংয়ে ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রাজস্ব খাতের কোনো লোকবল নেই। আউটসোর্সিংয়ের ১০ জনের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৪ জন কর্মচারী।

এ কর্মকর্তা বলেন, মূলত কারিগরি ত্রুটি ও তীব্র লোকবল সংকটের কারণেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই খামারে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করতে পারছি না। তবে খামারের সমস্ত সমস্যা সমাধান করে উৎপাদন প্রক্রিয়া দ্রুত পুনরায় সচল করার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। আশা করছি, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও জনবল পেলেই আমরা খামারটি দ্রুত চালু করতে পারব।

জেইউএস/কেএইচকে/এমএস