ঢাকার সাভার ও ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন আর আগের মতো দেশি কাঁঠাল, বড়ই কিংবা স্থানীয় ফলের বাগান চোখে পড়ে না। কয়েক বছর আগেও যেখানে মৌসুম এলেই দেশি কাঁঠালের গন্ধে ভরে উঠতো উপজেলা দুটির গ্রামের পথঘাট, সেখানে এখন দেখা মিলছে ভিয়েতনামি বারোমাসি কাঁঠাল, থাই পেয়ারা, ড্রাগন ফল ও অন্যান্য বিদেশি বা হাইব্রিড জাতের ফলের বাগান।
অধিক ফলন, সারা বছর উৎপাদন এবং বেশি লাভের আশায় কৃষকরা ঝুঁকছেন এসব ফল চাষে। তবে কৃষকদের এই পরিবর্তিত প্রবণতা দেশের ফল বৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে মনে করেন কৃষিবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা।
আরও পড়ুন
প্রযুক্তির অভাবে বছরজুড়ে মিলছে না তরমুজ
সাভারের শিমুলিয়া, আশুলিয়া, ধামসোনা, পাথালিয়া ও ধামরাইয়ের কুল্লা, সুতিপাড়া, নান্নার ও রোয়াইল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ড্রাগন ফল, থাই পেয়ারা ও বারোমাসি কাঁঠালের বাগানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, দেশি ফলের তুলনায় এসব ফলের চাহিদা ও বাজারমূল্য বেশি।
মোতাহার হোসেন নামের একজন কৃষক জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশি কাঁঠাল বছরে একবার ফল দেয়। কিন্তু বারোমাসি কাঁঠাল প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। বাজারে দামও ভালো। তাই নতুন জাতের দিকে ঝুঁকেছি।’
একই কথা জানান থাই পেয়ারা চাষি হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করে যে আয় হয়, তা দেশি ফল চাষ করে পাওয়া কঠিন। তাই অনেকেই এখন নতুন জাতের ফলের বাগান করছেন।’
আরও পড়ুন
আমের চেয়ে বেশি খরচ ক্যারেট-পরিবহনে, বিপাকে চাষিরা
কৃষকদের এই ঝোঁকের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে দেশের বহু দেশি ফলের জাত।
‘একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁঠালেরই ছিল অসংখ্য স্থানীয় জাত। একইভাবে আনারস, বরই, জাম, কলা, সফেদা ও অন্যান্য ফলেরও ছিল বহু বৈচিত্র্য। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কিছু নির্দিষ্ট জাতের চাষ বাড়তে থাকায় অনেক স্থানীয় জাত এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে’
একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁঠালেরই ছিল অসংখ্য স্থানীয় জাত। একইভাবে আনারস, বরই, জাম, কলা, সফেদা ও অন্যান্য ফলেরও ছিল বহু বৈচিত্র্য। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কিছু নির্দিষ্ট জাতের চাষ বাড়তে থাকায় অনেক স্থানীয় জাত এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ফল বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ জিল্লুর বলেন, ‘দেশের ফল বৈচিত্র্য কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। স্থানীয় জাতগুলো শুধু স্বাদের জন্য নয়; বরং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ।’
আরও পড়ুন
চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হলেন নাঈম, ড্রাগনেই বাজিমাত
তিনি বলেন, ‘দেশি ফলের জাতগুলো আমাদের জার্মপ্লাজম সম্পদের অংশ। এগুলোর মধ্যে অনেক মূল্যবান বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। যদি এসব জাত হারিয়ে যায়, তাহলে আমরা স্থায়ীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনগত সম্পদ হারাবো।’
এ বিশেষজ্ঞের মতে, কৃষিতে একক বা সীমিত কয়েকটি জাতের আধিপত্য বাড়লে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ একই ধরনের ফসল বা ফলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রোগবালাই ও জলবায়ুগত ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কোনো নতুন রোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
‘সাভারের শিমুলিয়া, আশুলিয়া, ধামসোনা, পাথালিয়া ও ধামরাইয়ের কুল্লা, সুতিপাড়া, নান্নার ও রোয়াইল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ড্রাগন ফল, থাই পেয়ারা ও বারোমাসি কাঁঠালের বাগানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, দেশি ফলের তুলনায় এসব ফলের চাহিদা ও বাজারমূল্য বেশি’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বিষয়টি শুধু কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমানে বাজারে জনপ্রিয়তা পাওয়া অনেক বিদেশি ফলের তুলনায় দেশি ফলের কিছু জাত অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন। কিন্তু সেগুলোর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কমে যাওয়ায় মানুষের খাদ্য তালিকা থেকেও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি
ফল বৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, কৃষি উৎপাদনে বাণিজ্যিকতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে লাভের পাশাপাশি দেশি ফলের জাত সংরক্ষণের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একসময় যে ফল বৈচিত্র্য ছিল, তা দ্রুত কমে যাচ্ছে বলে জানান পরিবেশকর্মী সালাউদ্দিন খান নাঈম।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় জাতের ফলগুলো শুধু খাদ্য নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ। বাজারের চাহিদার কারণে যদি সব জায়গায় একই ধরনের কয়েকটি ফলের চাষ হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে।’
‘বর্তমানে কৃষকরা লাভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন নীতি গ্রহণ করা, যাতে কৃষক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশি জাত সংরক্ষণেও উৎসাহ পান। এজন্য দেশি ফলের বাগান রক্ষণাবেক্ষণে প্রণোদনা, উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জাতের জিনব্যাংক শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন’
তার মতে, ফল বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। কারণ স্থানীয় জাতগুলো হারিয়ে গেলে সেগুলো পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে খাদ্য ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য কমে গেলে পুষ্টির উৎসও সীমিত হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা
পরিবেশকর্মী সালাউদ্দিন খান বলেন, ‘বর্তমানে কৃষকরা লাভের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন নীতি গ্রহণ করা, যাতে কৃষক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশি জাত সংরক্ষণেও উৎসাহ পান। এজন্য দেশি ফলের বাগান রক্ষণাবেক্ষণে প্রণোদনা, উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় জাতের জিনব্যাংক শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘বাণিজ্যিক ফল চাষের পাশাপাশি স্থানীয় ফলের জাত সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা নাহলে কয়েক দশক পর দেশের বহু ঐতিহ্যবাহী ফলের জাত শুধু গবেষণাগার কিংবা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।’
এসআর/এমএস








