আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটির খনিজ সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে তালেবান সরকার। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ আফগানিস্তানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা আফগান সম্পদ ছাড় করার আহ্বান জানাচ্ছে তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার এবং তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পর কাবুল কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সময়ের ঘটনাকে ‘আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেন, খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকে আফগানিস্তান ‘অবশ্যই’ স্বাগত জানাবে। কাবুলে নিজের কার্যালয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুত্তাকি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের সম্পর্ককে গত ২০ বছরের যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ককে দেখা উচিত। আমাদের অর্থনৈতিক নীতি উন্মুক্ত।’
তবে এই বিনিয়োগের প্রস্তাব সরাসরি হোয়াইট হাউসে দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মুত্তাকি কিছু বলেননি। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা-সমর্থিত আফগান সরকার পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক জরিপে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে তামা, লৌহ আকরিক, নিওবিয়াম, কোবাল্ট, সোনা ও লিথিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। তবে কয়েক দশকের সংঘাতের কারণে এসব সম্পদের বড় অংশ এখনো উত্তোলন করা হয়নি।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের খনি বিনিয়োগের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে তারা। এসব বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে সোনা, মূল্যবান পাথর ও ক্রোমাইট উত্তোলন। ক্রোমাইট ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এদিকে, আগস্টের মাঝামাঝি তালেবানের হাজার হাজার সমর্থক কাবুলের কেন্দ্রীয় এলাকায় জড়ো হয়। ইসলামপন্থী এই গোষ্ঠীর ক্ষমতায় ফেরার এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের পতনের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে তারা সেখানে সমাবেশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যাটো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে দেশটি এখনো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। ১৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে।
তালেবান শরিয়াহ আইন কার্যকর করেছে। এর ফলে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, ব্যবসা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তালেবানের নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তার বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির নির্দিষ্ট মানদণ্ড, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার বিষয়ে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তালেবানের কার্যত কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। এর মধ্যে কূটনীতিক গ্রহণ করা বা বিভিন্ন রাজধানীতে তালেবানের সঙ্গে বৈঠক করাও অন্তর্ভুক্ত।
কাবুলে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকরা বলেছেন, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হবে। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় তালেবানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে মুত্তাকিও আছেন, যিনি কয়েক দশক ধরে ইসলামপন্থী এই গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছেন। কূটনীতিকরা আরও আশঙ্কা করছেন, আফগানিস্তানে অর্থের প্রবাহ বাড়লে তা তালেবান সরকারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে এবং তাদের কঠোর নীতিগুলো পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তবে গত এক বছরে কাবুল ধীরে ধীরে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। চীন, ভারত, ইরান, কাতার এবং মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান কর্মকর্তাদের স্বাগত জানিয়েছে অথবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খুলেছে। গত বছর রাশিয়া তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর মে মাসে দেশটি তালেবানের সঙ্গে একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
জুন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো ব্রাসেলসে তালেবান কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে সম্ভাব্য অভিবাসী প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়। জার্মান কর্মকর্তারাও একই ধরনের আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তালেবান আশা করছে, এসব কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করবে এবং বিদেশে আটকে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ দেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে। মুত্তাকি বলেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো ‘তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।’
আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এখনো দেশের বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার একটি ‘আফগান ফান্ডে’ স্থানান্তর করে। সুদসহ বর্তমানে ওই অর্থের মূল্য ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই তহবিলের উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, যাতে সরাসরি তালেবান সরকার ওই অর্থের সুবিধা না পায়।
মুত্তাকি বলেন, ‘আফগান জনগণের সম্পদ কোনো ব্যক্তি, সরকার বা প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’ তিনি জানান, এসব জব্দ থাকা সম্পদ নিয়ে কাবুল সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে।
তবে তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি। বরং তিনি কাবুলের উত্তরে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটি আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তালেবান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। মুত্তাকি বলেন, ‘বাগরামসহ আফগানিস্তানের সব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা আফগানিস্তানের জাতীয় সম্পদ।’ তবে একই সঙ্গে তিনি হোয়াইট হাউসকে ২০২১ সালে পরিত্যক্ত মার্কিন দূতাবাস আবার খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মুত্তাকি বলেন, তালেবান দূতাবাসটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, সড়ক পুনর্নির্মাণ করেছে এবং সেখানে নতুন গাছ লাগিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এলাকাটি এখন বেশ প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় দেখায়।’







