দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য, খাদ্যাভাব ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় ১৯১৭ সালের মার্চে রোমানভ রাজবংশের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ২৫ অক্টোবর ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়, রাজতন্ত্রের পতন এবং বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে কীভাবে বদলে গিয়েছিল বিশ্বরাজনীতির গতিপথ, তা নিয়ে এ ফিরে দেখা।

১০৯ বছর আগে, ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়, তীব্র খাদ্যসংকট, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত রাশিয়ায় ঘটে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করে প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি। মার্কিন সাংবাদিক জন রিড তাঁর বিখ্যাত ‘টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড’ (বিশ্ব কাঁপানো ১০ দিন) বইয়ে যে ঘটনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছিলেন, ইতিহাসে তা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা থাকে, যা কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই বদলে দেয় না; বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা ও সামাজিক আন্দোলনের গতিপথও চিরতরে পাল্টে দেয়। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। রাশিয়ার তৎকালীন রাজধানী পেত্রোগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে পুরো বিশ্বের রাজনীতিতে অনুভূত হয়েছে। তবে যে বিপ্লব শতবর্ষ আগে বিশ্বব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, কয়েক মাস আগে রাশিয়ার শতবর্ষী রাজতন্ত্র ভেঙে না পড়লে তার বাস্তবায়ন হয়তো কখনোই সম্ভব হতো না।

জারশাসিত রাশিয়া ও রাজতন্ত্রের ভঙ্গুর ভিত্তি

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য। ১৯১৩ সালে পরম প্রতাপের সঙ্গে রাজবংশের শাসনামলের ৩০০ বছর উদ্‌যাপন করে রোমানভ রাজবংশ, যা ‘রোমানভ টারসেন্টেনারি’ নামে পরিচিত। সে সময় জারের সর্বময় ক্ষমতার ধারণা বা স্বৈরতন্ত্র আপাতদৃষ্টিতে নিশ্চিন্ত ও দীর্ঘস্থায়ী বলেই মনে হয়েছিল। তবে এই জমকালো উদ্‌যাপনের আড়ালেই সুপ্ত ছিল গভীর সামাজিক অসন্তোষ।

জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনামলে রাজনৈতিক ক্ষমতা মূলত রাজপরিবার ও অভিজাতদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। ১৮৬১ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও ভূমিসংকট ও গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর হয়নি। অন্যদিকে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে নগরগুলোতে কারখানাশ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের জীবনযাত্রার মান ছিল চরম শোচনীয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নামমাত্র মজুরি ও অনিরাপদ পরিবেশ শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই দাবি ১৯০৫ সালের বিপ্লবের সময়ই জোরালো হয়ে উঠেছিল। ওই বছরের জানুয়ারিতে পেত্রোগ্রাদে শ্রমিকদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে সরকারি বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনা ‘রক্তাক্ত রোববার’ নামে পরিচিতি পায়। আন্দোলনের মুখে জার নির্বাচিত আইনসভা ‘দুমা’ গঠনে সম্মত হলেও রাজতন্ত্রের হাতেই সব ক্ষমতা রেখে দেন, যা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়।

এ ছাড়া জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতনের বীজ বপন হয়েছিল তাঁর পারিবারিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যেও। সতেরো শতকের ঐতিহ্যবাহী ‘মাস্কোভি’ ভাবধারায় ফিরে যাওয়ার অন্ধ চেষ্টার অংশ হিসেবে ১৯০৭ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে নির্মিত হয় ‘চার্চ অন স্পিল্ড ব্লাড’।

তা ছাড়া জারের স্ত্রী রানি আলেকজান্দ্রা ছিলেন জন্মসূত্রে জার্মান রাজকন্যা, যা রুশ-জার্মান সম্পর্কের টানাপোড়েনের দিনে সাধারণ মানুষের মনে রাজপরিবারের প্রতি সংশয় তৈরি করে। তাঁদের একমাত্র ছেলে হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত হলে রাজদরবারে প্রবেশ ঘটে অদ্ভুত রহস্যময় সাধু রাসপুটিনের।

রাজপরিবারের ওপর রাসপুটিনের প্রভাবের গুজবে পুরো দেশ তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং রাজতন্ত্রের ভাবমূর্তি অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে একদল অভিজাত ব্যক্তি রাসপুটিনকে হত্যা করলেও রাজতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ফেব্রুয়ারি বিপ্লব

১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ রাশিয়ার বিদ্যমান সংকটকে এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যায়। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে ধসে পড়ে দেশটির অর্থনীতি। খাদ্যসংকট, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মানির বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক বিপর্যয়ে লাখ লাখ রুশ সৈন্য ও সাধারণ মানুষ চরম হতাশ হয়ে পড়ে। ১৯১৫ সালে জার দ্বিতীয় নিকোলাস নিজেই সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব নিলে যুদ্ধের সব ব্যর্থতার দায় সরাসরি তাঁর ওপর এসে পড়ে।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেত্রোগ্রাদে রুটির সংকট ও খাদ্যাভাবকে কেন্দ্র করে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। ২৩ ফেব্রুয়ারি (আন্তর্জাতিক নারী দিবস) নারী শ্রমিকদের আন্দোলন দ্রুতই সাধারণ শ্রমিক ও নাগরিকদের এক বিশাল গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকার বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেও সেনারা আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাব অনুধাবন করে ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় অবসান ঘটে দীর্ঘ তিন শতাব্দীর রোমানভ রাজবংশের শাসনের। পরবর্তী সময়ে ১৯১৮ সালের জুলাই মাসে নোংরা এক সেলারের ভেতরে ক্ষমতাচ্যুত জার ও তাঁর পুরো পরিবারকে বলশেভিকরা হত্যা করে।

দ্বৈত ক্ষমতা ও লেনিনের উত্থান

জারতন্ত্রের পতনের পর রাশিয়ায় গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু এই সরকার জনগণের মূল দাবি—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা, জমি পুনর্বণ্টন ও খাদ্যসংকট নিরসন করতে ব্যর্থ হয়। একই সময়ে কারখানা ও সেনাবাহিনীর ভেতরে গড়ে ওঠে শ্রমিক ও সৈন্যদের নিজস্ব কাউন্সিল বা ‘সোভিয়েত’। বিশেষ করে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের ব্যাপক প্রভাবের ফলে দেশে কার্যত এক ‘দ্বৈত ক্ষমতা’র সৃষ্টি হয়।

এই রাজনৈতিক শূন্যতার মুখে রাশিয়ার রাজনীতিতে আবির্ভূত হন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকার পর ১৯১৭ সালের এপ্রিলে জার্মান সামরিক কর্তৃপক্ষের বিশেষ সহায়তায় ট্রেনে চড়ে রাশিয়ায় ফেরেন এই মার্ক্সবাদী বিপ্লবী। লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের এখনই উপযুক্ত সময়।

বলশেভিকরা সাধারণ মানুষের কাছে তিনটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়—‘শান্তি, জমি ও রুটি’। এই তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি এবং ‘সব ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে দিন’—এই স্লোগান খুব দ্রুতই ক্লান্ত সৈন্য, বঞ্চিত কৃষক ও বিক্ষুব্ধ কারখানাশ্রমিকদের বলশেভিক পতাকাতলে একত্র করে।

বিশ্ব কাঁপানো ১০ দিন: ক্ষমতা দখলের চূড়ান্ত মুহূর্ত

১৯১৭ সালের অক্টোবরের শুরুর দিকে লেনিন আত্মগোপনে থেকেই বলশেভিকদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত করেন। ১০ অক্টোবর বলশেভিক পার্টির সেন্ট্রাল কমিটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। লিওন ট্রটস্কির নেতৃত্বাধীন ‘সামরিক বিপ্লবী কমিটি’ (এমআরসি) পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতকে সঙ্গে নিয়ে মূল অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শুরু করে।

১০–২৫ অক্টোবর: কৌশলগত অবকাঠামো দখল

১৬ থেকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে বলশেভিক অনুগত রেড গার্ড মিলিশিয়া ও বিপ্লবী নাবিকেরা পেত্রোগ্রাদের মূল যোগাযোগব্যবস্থা, নেভা নদীর ওপরের গুরুত্বপূর্ণ সেতু, টেলিগ্রাফ অফিস, ডাকঘর ও রেলস্টেশনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিঃশব্দে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী আলেকসান্দার কেরেনস্কি হুমকি অনুধাবন করতে দেরি করে ফেলেন এবং সেতু তুলে দিয়ে অভ্যুত্থান ঠেকানোর শেষ চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়।

২৫–২৬ অক্টোবর: উইন্টার প্যালেস অভিযান

২৪ অক্টোবর রাত থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে পুরো পেত্রোগ্রাদ শহরের নিয়ন্ত্রণ বলশেভিকদের হাতে চলে যায়। সাবেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্মোলনি ইনস্টিটিউট’ পরিণত হয় বিপ্লবের মূল কেন্দ্র বা সদর দপ্তরে। ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় বলশেভিক অনুগত যুদ্ধজাহাজ ‘অরোরা’ থেকে ফাঁকা গোলাবর্ষণ করে ঐতিহাসিক ‘উইন্টার প্যালেস’ (শীতপ্রাসাদ) আক্রমণের সংকেত দেওয়া হয়।

সেখানে অবস্থানরত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ২৬ অক্টোবর ভোরের মধ্যে শীতপ্রাসাদ সম্পূর্ণরূপে দখল করা হয় এবং সরকারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা হয়; তবে প্রধানমন্ত্রী কেরেনস্কি কোনোমতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

২৬ অক্টোবর: নতুন ডিক্রি ও সোভিয়েত ক্ষমতার সূচনা

২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সর্বরাশিয়া সোভিয়েত কংগ্রেসে লেনিন আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েতদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে দুটি ঐতিহাসিক ডিক্রি জারি করা হয়—‘শান্তি অধ্যাদেশ’ (যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান) ও ‘ভূমি অধ্যাদেশ’ (কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন)। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন সরকার বিপুল জনসমর্থন অর্জন করে। যদিও এর প্রতিবাদে মধ্যপন্থী সমাজতান্ত্রিক ও মেনশেভিকরা কংগ্রেস বর্জন করে বের হয়ে যায়।

রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি আয়োজিত রেড অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে মস্কোর সেন্ট্রাল স্কয়ারে মিছিলে অংশ নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা

২৭–৩১ অক্টোবর: মস্কো দখল ও কেরেনস্কির পরাজয়

২৭ অক্টোবর লেনিনকে প্রধান করে গঠিত হয় নতুন সরকার—‘কাউন্সিল অব পিপলস কমিসার্স’। ৩০ অক্টোবর চার্সকোয়ে সেলোতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুগত ডন কস্যাক বাহিনীকে পরাজিত করে রেড গার্ডরা। এরপর কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সড়ক যুদ্ধ ও তোপ দাগানোর পর ৩১ অক্টোবর রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মস্কোও বলশেভিকদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ, নির্বাচন ও গৃহযুদ্ধ

ক্ষমতা দখলের পর নতুন বলশেভিক সরকারকে প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা, সিভিল সার্ভিসের অসহযোগিতা ও বুর্জোয়াদের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। লেনিন কঠোর হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন; তিনি সব ব্যাংক ও কারখানা জাতীয়করণ করেন এবং অর্থনীতি পরিচালনার জন্য গঠন করেন ‘সুপ্রিম অর্থনৈতিক কাউন্সিল’।

কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্য রূপ নেয় ১৯১৭ সালের ১২ নভেম্বরের গণপরিষদ (কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে। গণতান্ত্রিক এই নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট-রেভোলিউশনারি পার্টি প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, যেখানে বলশেভিকরা পায় ২৫ শতাংশের কম ভোট।

১৯১৮ সালের ৫ জানুয়ারি নবনির্বাচিত পরিষদ যখন বলশেভিকদের ডিক্রিগুলো মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন লেনিন সশস্ত্র বাহিনী পাঠিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিষদটি ভেঙে দেন।

গণতান্ত্রিক সংসদ ভেঙে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত রাশিয়াজুড়ে বলশেভিকবিরোধী শক্তিগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলে ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী রক্তক্ষয়ী ‘রুশ গৃহযুদ্ধ’-এর সূত্রপাত ঘটে। এক পক্ষে ছিল বলশেভিকদের ‘লাল ফৌজ’ (রেড আর্মি), আর অন্য পক্ষে ছিল রাজতন্ত্রপন্থী, উদারপন্থী ও ভিন্ন মতাবলম্বী সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত হোয়াইট আর্মি।

ইতিহাস ও আধুনিক বিশ্বে অক্টোবর বিপ্লবের উত্তরাধিকার

গৃহযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও ট্রান্সককেশীয় অঞ্চল নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ইউনিয়ন’ (ইউএসএসআর) বা সোভিয়েত ইউনিয়ন।

পরবর্তী দশকগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত শিল্পায়ন, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, শিক্ষাবিস্তার এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব উন্নতি অর্জন করে—যার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ ছিল স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ ও ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশযাত্রা। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি যোসেফ স্তালিনের শাসনামলে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বাধ্যতামূলক সমবায়ীকরণ ও শ্রমশিবিরের মতো অন্ধকার অধ্যায়ও রচিত হয়।

তবে অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব শুধু রাশিয়ার ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকেনি। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও সামাজিক মালিকানার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে একাধিক কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়।

এশিয়া ও আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিকামী মানুষের কাছে এই বিপ্লব হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক ও আদর্শগত দ্বন্দ্বের (স্নায়ুযুদ্ধ) মূল ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে এই বিপ্লব।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অবসান ঘটলেও ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব আজও ইতিহাসের অন্যতম চর্চিত বিষয়। এটি প্রমাণ করেছে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক বৈষম্য কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠিত রাজ্যকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। বিপ্লবের ঘোষিত সাম্য ও শোষণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথ কতটা জটিল ও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে, বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় অক্টোবর বিপ্লব আজও তার এক জ্বলন্ত দলিল।

তথ্যসূত্র: লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, যুক্তরাষ্ট্র: রুশ বিপ্লব, দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনকাল ও গৃহযুদ্ধবিষয়ক ঐতিহাসিক দলিল ও উপকরণ।

ইউনাইটেড স্টেটস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম: রুশ বিপ্লব ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত নিবন্ধ।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা: রুশ বিপ্লব, বলশেভিক দল, লেনিন ও অক্টোবর বিপ্লবের সার্বিক সময়রেখা ও ইতিহাস।

টাইম সাময়িকী ড্যানি বার্ডের নিবন্ধ

দ্য কালেক্টর: রবিন গিলহামের নিবন্ধ

জন রিডের বই: ‘টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড’ (১৯১৯)।