লাল জার্সি পরা খেলোয়াড়েরা আনন্দে লাফাচ্ছেন। সতীর্থদের গায়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন শ্যাম্পেন। চারপাশে উড়ছে ছোট ছোট রঙিন কাগজের টুকরো (কনফেটি) ও রঙিন ফিতা। মোবাইল ফোন হাতে উল্লাসে মেতে উঠেছেন দর্শকেরা। দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, সদ্যই বিশ্বকাপ জিতেছে কোনো ফুটবল দল। কিন্তু এটি বিশ্বকাপের মঞ্চ নয়। এটি মূলত চীনের হেবেই প্রদেশের পাহাড়ি ও গ্রামীণ ফুপিং কাউন্টিতে অনুষ্ঠিত একটি স্থানীয় ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল।

চীনের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দল দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে না পরলেও দেশটির গ্রামাঞ্চল ও ছোট শহরগুলোতে ফুটবল নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক উন্মাদনা। ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ নামের অপেশাদার এই প্রতিযোগিতা এখন দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে ওঠার লক্ষ্যে শত শত দল স্থানীয় পর্যায়ে লড়ছে, আর খেলা দেখতে মাঠে ভিড় করছেন লাখো মানুষ।

একসময় একটি দরিদ্র গ্রামীণ কাউন্টির স্থানীয় লিগ হিসেবে শুরু হওয়া এই আয়োজন এখন চীনের প্রায় ৬০টি লিগ ও শত শত দলকে যুক্ত করেছে। ধারণাটি খুবই সহজ—চাকরি, ব্যবসা কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ নিজেদের দল গঠন করবেন, স্থানীয় পর্যায়ে খেলবেন এবং সেরা দলগুলো জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। খেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎসব, মেলা ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রদর্শনীও।

ফুপিংয়ের ৩২ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক গেং ইয়াং বলেন, দারিদ্র্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পর নিজেদের এলাকার মানুষের প্রাণশক্তি তুলে ধরতে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাইরের মানুষকে নিজেদের শহর ও গ্রামের সঙ্গে পরিচিত করানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

চীনের স্থানীয় প্রশাসনও এই প্রতিযোগিতার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুর্বল ভোগব্যয় ও ঋণের চাপে থাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে খেলাধুলা ও পর্যটনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বিভিন্ন শহর ও কাউন্টি। ফুপিংয়ে একটি ম্যাচকে ঘিরে আয়োজিত রাতের বাজারে বারবিকিউ, ঠান্ডা নুডলস, মিষ্টিসহ নানা খাবারের দোকান বসে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের পণ্য ও সেবা প্রচারের সুযোগ পান।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ফুপিং কাউন্টি লিগের উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে ২ লাখ ইউয়ানের বেশি বেচাকেনা হয়েছিল। স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁর মালিক জানান, ম্যাচের দিন রাতের বাজারে খাবারের স্টল বসিয়ে তাঁর আয় প্রায় ১০ হাজার ইউয়ান বেড়েছিল।

তবে এই লিগের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণই নয়, চীনের পেশাদার ফুটবলে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অনিয়মে হতাশ দর্শকদের কাছে গ্রামীণ ফুটবল যেন নতুন আশার প্রতীক। একসময় বিদেশি তারকাদের বিপুল অর্থে দলে ভেড়ানো চীনা ক্লাবগুলোর অনেকগুলোই পরে আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কয়েকজন ফুটবল কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে নিষিদ্ধ বা কারাবন্দী হয়েছেন। বিপরীতে, চীনের জাতীয় পুরুষ দল ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপের মূলপর্বে উঠতে পারেনি।

এই বাস্তবতায় ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ সাধারণ মানুষের ফুটবলপ্রেমকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখানে পেশাদার তারকার বদলে মাঠে নামেন চিকিৎসক, শিক্ষক, কলেজছাত্র, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। দর্শকদের কাছে তাঁদের লড়াইয়ের আবেদনও আলাদা।

ফুপিংয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিউ জিয়াপিং বলেন, চীন যখন বিশ্বকাপে খেলতে পারে না, তখন স্থানীয় ফুটবল দেখাই তাঁর কাছে বেশি আনন্দের। মাঠে এসে দেশের ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুভূতি পাওয়া যায়—ঘরে বসে ফোন দেখার চেয়ে যা অনেক বেশি উপভোগ্য।

এই আন্দোলনের সূচনা অবশ্য আরও আগে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুইঝোউ প্রদেশের রংজিয়াং কাউন্টিতে। ২০২৩ সালে সেখানকার গ্রামীণ ফুটবল লিগ সরলতা, খেলাটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও উৎসবমুখর পরিবেশের কারণে সারা দেশে আলোড়ন তোলে। পরে তার অনুকরণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য ‘ভিলেজ সুপার লিগ’।

ফুপিংয়ের আয়োজকেরা মনে করছেন, এই গণভিত্তিক ফুটবল আন্দোলন ভবিষ্যতে চীনের জাতীয় দলকেও নতুন প্রতিভা দিতে পারে। আয়োজক গাও চিয়াংয়ের ভাষায়, দর্শকেরা এখন শুধু ফুটবল উপভোগ করছেন না; তাঁরা খেলাটি বুঝতে শিখছেন এবং ফুটবলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন।

ফুপিংয়ের ফাইনালে শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক লুওতুওওয়ান গ্রামের দল ১-০ গোলে জয় পেয়ে জাতীয় ফাইনালে জায়গা করে নেয়। পরাজিত দলের ডেন্টিস্ট-ফুটবলার থং জেহাওয়ের মুখে ছিল হতাশা, কিন্তু চোখে ছিল পরের মৌসুমের স্বপ্ন। তাঁর কথায়, ‘জয়-পরাজয় খেলারই অংশ। আমরা তা মেনে নিতে পারি। আগামী বছর আবার ফিরে এসে লড়ব।’

বিশ্বকাপের মঞ্চে চীনের অনুপস্থিতি যতই দীর্ঘ হোক, দেশটির গ্রামগুলোতে ফুটবল থেমে নেই। বরং সেখানেই হয়তো জন্ম নিচ্ছে চীনের ফুটবলের নতুন গল্প—যেখানে তারকা নয়, সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছেন খেলার নায়ক।

সিএনএন অবলম্বনে