বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় তখন তখন কেবলই ইতিহাস আর আবেগের মহামিলন। টাইব্রেকারের শেষ বলটি যখন জালের ঠিকানা খুঁজে নিল, তখন ডালাস স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছাপিয়ে সেই উল্লাসের প্রতিধ্বনি যেন আছড়ে পড়ল হাজার মাইল দূরের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে মিশর।তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের পর আল ফারাওদের আনন্দ উদযাপন শুধু নিজেদের সীমানায় আটকে থাকেনি, তা রূপ নিয়েছে এক মানবিক উপাখ্যানে। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবলীয় অর্জনটিকে মিশর দল উৎসর্গ করেছে আজন্মের চেনা প্রতিবেশী, যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের উদ্দেশ্যে।ডালাস স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর পেনাল্টি শুটআউটে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-২ ব্যবধানে হারায় মিশর। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয় বিশ্ব। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের প্রথম জয়ের পর পুরো মিশরীয় দল মাঠের মাঝেই একসাথে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। এরপর মাঠের ভেতরেই দেখা যায় এক আবেঘন দৃশ্য। মিশরের কোচ হোসাম হাসান মাঠের ভেতরে নিজের দেশের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পতাকাও উঁচিয়ে ধরেন।ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কোচ হোসাম হাসান আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "আল্লাহ ফিলিস্তিনিদের বিজয় দান করুন এবং তাদের শহীদদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।" বুকভরা ভালোবাসা আর সংহতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "আই ওয়ান্ট টু টেল দেম— এই ঐতিহাসিক জয়টি মিশরের মানুষের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের সেই সম্মানিত জনগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।"মিশরের এই জয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাঁধভাঙা আনন্দ প্রকাশ করেছেন লাখো ফিলিস্তিনি ফুটবলপ্রেমী। বোমায় বিধ্বস্ত ভবন আর অস্থায়ী তাঁবুর পটভূমিতে প্রজেক্টরে খেলা দেখার কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে চোখ ভিজেছে বিশ্ববাসীর। অনেকের মুখে ছিল চওড়া হাসি, আর নিষ্পাপ শিশুদের গালে আঁকা ছিল মিশরের পতাকা।গাজার বাসিন্দা তামের নাভেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তার অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছেন, "জীবনে এই প্রথমবার বিশ্বকাপ নিয়ে আমি এতোটা উত্তেজিত। একটু আগে মিশরের জয় দেখে খুব ভালো লেগেছে, তবে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল এখানকার—হাজার হাজার মানুষ তাদের তাবু এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ম্যাচটি দেখছিলেন।"চারপাশের নির্মম বাস্তবতার মাঝে ফুটবল কীভাবে আশার আলো ছড়ায়, তা ফুটিয়ে তুলে তিনি আরও লেখেন, "চারপাশের এতো কষ্টের মাঝেও সবার মুখে হাসি ফুটেছিল, চারদিক উল্লাসে মুখরিত হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের নির্মম বাস্তবতাকে ভুলে প্রত্যেকে নিজেদের একটুখানি বাঁচার আনন্দ উপহার দিতে চেয়েছিল।"৯২ বছরের দুঃখ মুছে ফারাওরা যখন নতুন ইতিহাস লিখল, তখন সেই ইতিহাসের পাতায় ফিলিস্তিনের নাম জুড়ে দিয়ে ফুটবলকে তারা স্রেফ একটি খেলার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেল। বিশ্বমঞ্চে মিশরের এই জয় কেবল শেষ ষোলোর টিকিট নয়, বরং তা হয়ে রইল যুদ্ধ আর ধ্বংসের মাঝে বেঁচে থাকার এক পরম সঞ্জীবনী সুধা। আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০ টায় শেষ ষোলোর মহালড়াইয়ে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে মিশর। সেই ম্যাচে ফিলিস্তিনের কোটি মানুষের প্রার্থনা আর ভালোবাসা যে মাঠের এগারো জন ফারাওয়ের সাথে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।