রাতে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, অগণিত নক্ষত্র স্থির হয়ে আছে। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের বলছে, মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। এখানে প্রতিনিয়ত নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু হচ্ছে, নতুন নতুন গ্রহাণু তীব্র গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে, বিশাল সব সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে চারপাশ আলোকিত করে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রূপটি যদি একটি বিশাল টাইম-ল্যাপস মুভির মতো রেকর্ড করা যেত, তাহলে কেমন হতো?
ঠিক এই অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য কাজটিই করতে শুরু করেছে চিলিতে অবস্থিত ভেরা রুবিন অবজারভেটরি। আগামী দশ বছর ধরে তারা রাতের আকাশের এমন এক নিখুঁত ও বিস্তৃত ছবি তুলে রাখবে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগে কোনো দিন সম্ভব হয়নি।
এই বিশাল মহাযজ্ঞের নাম দেওয়া হয়েছে লিগ্যাসি সার্ভে অব স্পেস অ্যান্ড টাইম, সংক্ষেপে এলএসএসটি। বিজ্ঞানীরা একে ভালোবেসে বলছেন ‘মহাবিশ্বের দশ বছর দীর্ঘ মুভি’। তাঁদের এই দাবি একেবারেই যৌক্তিক। এই মানমন্দির এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন এটি আগামী দশ বছর ধরে চিলির আকাশ থেকে পুরো দৃশ্যমান আকাশের নিখুঁত ম্যাপ তৈরি করতে পারে।

এলএসএসটির প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেলজকো ইভজিক এই প্রজেক্টের অনন্যতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘রুবিনের এই সার্ভেটি একদমই আলাদা। কারণ এর আগে কোনো একক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় একসঙ্গে এত বিশাল আকাশ (পুরো আকাশের অর্ধেক), এত নিখুঁত সেন্সিটিভিটি এবং টানা এক দশক ধরে বারবার পর্যবেক্ষণের সুযোগ মেলেনি।’
মূল কাজ শুরুর আগেই ১১ হাজার গ্রহাণু আবিষ্কার করেছে ভেরা সি. রুবিন মানমন্দিরভেরা রুবিন অবজারভেটরির মাউন্ট এতটাই উন্নত যে, এটি মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ন্যূনতম ভাইব্রেশন ছাড়াই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলতে পারে!
কিন্তু কীভাবে সম্ভব হবে এই অসাধ্য সাধন? এর পেছনে রয়েছে চমৎকার এক প্রযুক্তিগত নকশা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ক্যামেরার জাদু।
শুরুতেই অবজারভেটরির আয়নার কথায় আসি। এই টেলিস্কোপে আছে ৮ মিটার চওড়া একটি বিশাল আয়না। তবে এর সবচেয়ে উদ্ভাবনী দিক হলো, এর প্রাইমারি এবং টারশিয়ারি (প্রথম ও তৃতীয়) আয়নাকে মাত্র একটি তলে যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ঘটনা এটাই প্রথম।

যেকোনো বড় টেলিস্কোপের একটা বড় সমস্যা হলো, এর বিশাল ওজন এবং নড়াচড়ার ধীরগতি। কিন্তু দুটি আয়নাকে একসঙ্গে যুক্ত করার ফলে এই টেলিস্কোপটিকে খুব সহজেই নাড়াচাড়া করা যায়। আকাশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চোখ সরাতে গেলে টেলিস্কোপের দ্রুত নড়াচড়া করাটা ভীষণ জরুরি। ভেরা রুবিন অবজারভেটরির মাউন্ট এতই উন্নত যে, এটি মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ন্যূনতম ভাইব্রেশন ছাড়াই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলতে পারে!
ভেরা রুবিন টেলিস্কোপের প্রথম ছবি প্রকাশযেকোনো বড় টেলিস্কোপের একটা বড় সমস্যা হলো, এর বিশাল ওজন এবং নড়াচড়ার ধীরগতি। কিন্তু দুটি আয়নাকে একসঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভেরা রুবিন টেলিস্কোপটিকে খুব সহজেই নাড়াচাড়া করা যায়।
এই অবজারভেটরির আসল জাদুকর এর অবিশ্বাস্য ডিজিটাল ক্যামেরাটি। আপনার হাতের স্মার্টফোনটি হয়তো ৫০ বা ১০০ মেগাপিক্সেলের। আর এই দানবীয় ক্যামেরার রেজল্যুশন ৩২০০ মেগাপিক্সেল!
এর আকারও চোখ কপালে তোলার মতো। ক্যামেরাটির ওজন ৩ হাজার কেজি, যা প্রায় একটি মাঝারি আকৃতির গাড়ির সমান। এর লেন্স এতই বড় যে একবার ক্লিক করলে এই ক্যামেরা আকাশের যে বিশাল অংশের ছবি তুলবে, তা আকাশে পাশাপাশি রাখা ৪৫টি পূর্ণিমার চাঁদের সমান!

এর রেজল্যুশনের আরও একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া যাক। এটি এতটাই নিখুঁত যে, ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে একটি ছোট গলফ বলের ছবিও এটি একদম স্পষ্ট তুলে আনতে পারবে। এই ক্যামেরায় তোলা মাত্র একটি ছবি যদি আপনি সম্পূর্ণ রেজল্যুশনে দেখতে চান, তবে আপনার ঘরের টিভিটি যথেষ্ট হবে না। আপনাকে ৩৭৮টি ফোর-কে আল্ট্রা-এইচডি টেলিভিশন পাশাপাশি একটি বিশাল গ্রিডে সাজিয়ে বসতে হবে!
৩২০০ মেগাপিক্সেলের বিশ্বের বৃহত্তম ক্যামেরা এখন প্রস্তুতভেরা রুবিন অবজারভেটরির ক্যামেরার লেন্স এতই বড় যে একবার ক্লিক করলে এই ক্যামেরা আকাশের যে বিশাল অংশের ছবি তুলবে, তা আকাশে পাশাপাশি রাখা ৪৫টি পূর্ণিমার চাঁদের সমান!
কী খুঁজবে এই অবজারভেটরি?
সেন্সিটিভিটির কারণে এলএসএসটি প্রায় ৪ হাজার কোটি মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।
পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটি। মানব ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞান ক্যাটালগে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি মহাজাগতিক বস্তুর তালিকা থাকতে যাচ্ছে!
এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক গেম চেঞ্জার। এই সার্ভের সম্পূর্ণ ডেটা হয়তো বছরে একবার প্রকাশ করা হবে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রতি রাতে যখনই আকাশে কোনো অদ্ভুত বা নতুন কিছু ধরা পড়বে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজ্ঞানীদের কাছে মিলিয়ন মিলিয়ন নোটিফিকেশন চলে যাবে।
এই অদ্ভুত জিনিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর হতে পারে আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুগুলো, যেমন ধূমকেতু ৩আই/অ্যাটলাস। এগুলো অন্য সৌরজগত থেকে আমাদের সৌরজগতে ঘুরতে আসা ভিনদেশি মেহমান। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, রুবিন অবজারভেটরির সাহায্যে এমন কয়েক ডজন ভিনদেশি বস্তুর খোঁজ মিলতে পারে।






