বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক সম্প্রতি ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর দেশের উচ্চশিক্ষা ও জনপ্রশাসন ব্যবস্থার একটি অন্তহীন অন্ধকার গলিপথ উন্মোচিত হয়েছে। এবারের ফলাফল কেবল ১ হাজার ৩২০ জন প্রার্থীর ক্যাডার হওয়ার আনন্দবার্তা নয়, বরং তা আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য এক চরম সতর্কঘণ্টা। ফলাফলের বিস্তারিত পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে দেশে লাখো শিক্ষিত তরুণ একটি সরকারি চাকরির জন্য হাহাকার করছেন, সেখানে সাধারণ শিক্ষা ও টেকনিক্যাল ক্যাডারের বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে পদের পর পদ শূন্য পড়ে আছে, অথচ যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যায়নি।

পরিসংখ্যানের এই রূঢ় বাস্তবতা আমাদের এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ৪৭তম বিসিএসে আইসিটির মতো অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ের ৫০টি পদের বিপরীতে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ২ জন। গণিতের ৪২টি পদের বিপরীতে মাত্র ১ জন। হিসাববিজ্ঞানে ৪২টি পদের মধ্যে ৩ জন, রসায়নে ৪৫টি পদের মধ্যে ১৮ জন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ৯০টি পদের মধ্যে ৯ জন, দর্শনে ৪৮টি পদের বিপরীতে মাত্র ২ জন এবং বাংলায় ১৩২টি পদের বিপরীতে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ৮ জন। এই বিপুল শূন্যতার মূল কারণ কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব একাডেমিক পড়াশোনায় চরম অনীহা।

একজন চিকিৎসক যখন স্টেথোস্কোপ ফেলে সার্কেলের এএসপি হন, কিংবা একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার যখন কোডিং ছেড়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে গম বা চালের গুদাম পরিদর্শন করেন, তখন ব্যক্তি হিসেবে তিনি হয়তো ক্ষমতাবান হন, কিন্তু রাষ্ট্র হারায় বহু যত্নে গড়া একজন বিশেষজ্ঞকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পা রেখেই শিক্ষার্থীরা এখন আর শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যবই বা গবেষণাগারে সময় দিতে চাচ্ছেন না। তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় দিনরাত খেটে স্বর্ণপদক পেলেও রাষ্ট্রের চোখে তার মূল্য নেই, যদি না নামের পাশে একটি ‘সাধারণ ক্যাডার’ (প্রশাসন, পুলিশ বা পররাষ্ট্র) সিলমোহর জুড়ে দেওয়া যায়। ফলে ডিগ্রির পড়াশোনাকে কেবলই দায়সারাভাবে পার করে দিয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই মেধাবীরা নীলক্ষেতের বিসিএস গাইডবই মুখস্থ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে ৪৭তম বিসিএসের এই শূন্য পদের খতিয়ানে।

মেধাবীদের এই নিজস্ব ক্ষেত্রবিমুখতার আরেকটি পিঠ হলো কারিগরি ও প্রফেশনাল প্রার্থীদের গণহারে সাধারণ ক্যাডারের দিকে ধাবিত হওয়া। অতীতের পাঁচটি বিসিএস পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করলে এই আশঙ্কাজনক প্রবণতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। এই পাঁচটি বিসিএসে শীর্ষ তিন সাধারণ ক্যাডারে (প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র) যে ১ হাজার ৯৮০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাস করা প্রকৌশলী ও চিকিৎসক।

একটি রাষ্ট্র তখনই কাঠামোগতভাবে দেউলিয়া হতে শুরু করে, যখন তার শিক্ষকেরা ক্লাসরুম ছেড়ে রাজপথে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন, চিকিৎসকেরা মর্যাদার সংকটে ভোগেন এবং প্রকৌশলীরা তাঁদের পেশা ছেড়ে ফাইল চালাচালির ক্ষমতাকে পরম সৌভাগ্য মনে করেন।

রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ভর্তুকিতে তৈরি হওয়া এই বিশেষায়িত মানবসম্পদের প্রায় ২০ শতাংশই তাঁদের মূল পেশা ছেড়ে মাঠ প্রশাসন বা টেবিল-চেয়ারের ফাইলে সই করার কাজ বেছে নিচ্ছেন। একজন চিকিৎসক যখন স্টেথোস্কোপ ফেলে সার্কেলের এএসপি হন, কিংবা একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার যখন কোডিং ছেড়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে গম বা চালের গুদাম পরিদর্শন করেন, তখন ব্যক্তি হিসেবে তিনি হয়তো ক্ষমতাবান হন, কিন্তু রাষ্ট্র হারায় বহু যত্নে গড়া একজন বিশেষজ্ঞকে। এটি আন্তর্জাতিক ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের চেয়েও বিপজ্জনক এক ‘অভ্যন্তরীণ মেধা অপচয়’।

মেধাবীরা কেন তাঁদের ভালোবাসার পেশা, ল্যাবরেটরি বা হাসপাতাল ছেড়ে আমলাতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিসিএসের পরতে পরতে জমে থাকা তীব্র আন্তক্যাডার বৈষম্যের মধ্যে। চাকরির সুযোগসুবিধা ও মর্যাদা নির্ধারণের মূল হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল কাজের পরিধি, জনকল্যাণ ও ঝুঁকি। কিন্তু বাংলাদেশে তা নির্ধারিত হয় ক্যাডারের নাম দেখে।

বৈষম্যের রূপটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সুযোগ-সুবিধার বণ্টনে। উদাহরণস্বরূপ, পররাষ্ট্র ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা বিদেশে পদায়নকালে যে পরিমাণ বিদেশ ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, চিকিৎসা-সুবিধা, সন্তানদের পড়াশোনার ভাতা এবং সরকারি ব্যয়ে গৃহপরিচারক পান, তার বিপরীতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা একজন চিকিৎসক বা কলেজের আলো ছড়ানো একজন শিক্ষক পান কেবলই অবহেলা।

মেধাবীরা কেন তাঁদের ভালোবাসার পেশা, ল্যাবরেটরি বা হাসপাতাল ছেড়ে আমলাতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন, তার উত্তর লুকিয়ে আছে বিসিএসের পরতে পরতে জমে থাকা তীব্র আন্তক্যাডার বৈষম্যের মধ্যে
ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই হবে ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার বড় মাধ্যম

পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা ও গ্রেড-বৈষম্য এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেখানে তিন বছরে এবং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মাত্র দুই বছরে নবম গ্রেড থেকে লাফিয়ে ষষ্ঠ গ্রেডে চলে যাচ্ছেন, সেখানে বিসিএসের প্রফেশনাল বা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একই গ্রেডে পৌঁছাতে লেগে যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ বছর।

৩৬তম বিসিএসের (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের শিক্ষকদের বাস্তব উদাহরণটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ২০১৮ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই শিক্ষকেরা দীর্ঘ আট বছর ধরে আজও ‘প্রভাষক’ পদেই স্তিমিত হয়ে আছেন। অথচ তাঁদের চোখের সামনে দিয়ে ৩৮তম বিসিএসের সাধারণ ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। এমনকি ২০২১ সালে ব্যাংক বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া জুনিয়র কর্মকর্তারাও আজ তাঁদের চেয়ে উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত।

গ্রেডের এই পিরামিড-বৈষম্য আরও প্রকট হয়, যখন আমরা কর্মজীবনের সর্বোচ্চ পদের দিকে তাকাই। শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদোন্নতির সীমা অধ্যাপক পদটি মাত্র ৪ নম্বর গ্রেডের, যার ওপরে যাওয়ার কোনো পথ বা সুযোগ রাষ্ট্র রাখেনি। স্বাস্থ্য ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদোন্নতি অধ্যাপক ৩ নম্বর গ্রেড হলেও মাত্র ৫ শতাংশ চিকিৎসকই কর্মজীবনে এই গ্রেডে পৌঁছাতে পারেন, বাকিরা পারেন না। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ১ নম্বর গ্রেড বা সচিব পদটি যেন এক চিরস্থায়ী অধিকার অথচ উপসচিব থেকে তদূর্ধ্ব পদগুলো রাষ্ট্রের। একটি ক্যাডারেই প্রায় ৮০টির অধিক গ্রেড ওয়ান পদ রয়েছে অথচ অন্যান্য ক্যাডারের সম্প্রতি ১টি করে গ্রেড-১ পদ সৃষ্টি করা হলেও সেখানে পৌঁছানোর পদসোপান তৈরি হয়নি, ফলে শিক্ষা ক্যাডারের চেয়ে তিন ধাপ এবং স্বাস্থ্য ক্যাডারের চেয়ে ২ ধাপ ওপরে প্রশাসন ক্যাডারের এই অবস্থান মূলত ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদেরই অবশিষ্টাংশ, যা স্বাধীন বাংলাদেশের সমতার সংবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

বিসিএস পরীক্ষা শেষ করে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

এই কাঠামোগত নিপীড়নের ফলেই আজ চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র মর্যাদার সংকট তৈরি হয়েছে। হাসপাতালে দিনরাত রোগী দেখা একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা যখন দেখেন, তাঁর চেয়ে বয়সে ও চাকরিতে জুনিয়র একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হয়ে তাঁর ওপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন, তখন চিকিৎসকেরা চরম হীনম্মন্যতায় ভোগেন।

এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নেয় পেশাজীবীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কারিগরি ও পেশাজীবী ক্যাডারদের আন্দোলনের মূল উৎস কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধার লোভ নয়; বরং এটি সমমর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক ন্যায্য লড়াই। তাঁরা যখন দেখেন, রাষ্ট্র তাঁদের মেধাকে অবমূল্যায়ন করে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারকে সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত করেছে, তখন ক্যাডার পরিবর্তনের এই ইঁদুরদৌড় এবং রাজপথের আন্দোলন ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না।

একটি রাষ্ট্র তখনই কাঠামোগতভাবে দেউলিয়া হতে শুরু করে, যখন তার শিক্ষকেরা ক্লাসরুম ছেড়ে রাজপথে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন, চিকিৎসকেরা মর্যাদার সংকটে ভোগেন এবং প্রকৌশলীরা তাঁদের পেশা ছেড়ে ফাইল চালাচালির ক্ষমতাকে পরম সৌভাগ্য মনে করেন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন চাকরি, পদ ৪৪, বয়স ৩৫ হলেও আবেদন

৪৭তম বিসিএসের শূন্য পদের দীর্ঘ তালিকা আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর তীব্র আলোর নিচে থাকা অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত করে দিয়েছে। শতভাগ সমতা বিধান রাতারাতি সম্ভব না হলেও আন্তরিক সদিচ্ছা থাকলে পর্যায়ক্রমে সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধান করা যায়। যার মধ্যে প্রথমেই আসতে পারে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করে হলেও ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয় উচ্চতর গ্রেড প্রদানের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা সম্ভব।

এই কাঠামোগত আন্তক্যাডার বৈষম্য দ্রুত দূর করা না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হয়তো কিছু ক্ষমতাবান আমলা পাবে, কিন্তু দেশ গড়ার মতো কোনো দক্ষ শিক্ষক ও প্রকৌশলী কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বিজ্ঞানী খুঁজে পাবে না। রাষ্ট্র কি এখন এই আত্মঘাতী পথেই হাঁটবে, নাকি অচলায়তন ভেঙে মেধার সমতা ফিরিয়ে আনবে?

*লেখক: সচিব তালুকদার ও অরিয়ন তালুকদার, শিক্ষক ও লেখক

চীনে বিনা মূল্যে স্নাতকোত্তর, শোয়ার্জম্যান স্কলারস প্রোগ্রামের সব তথ্য জেনে নিন