নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন আরও একবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। রাউন্ড অব ১৬-এর রোমাঞ্চকর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে সেলেসাওরা। ১৯৬৬ সালের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর এটাই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে ফল। এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পর যখন চারপাশে কান্নার রোল, ঠিক তখনই সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ থাকলেও তার কণ্ঠে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়।

ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইটা জমজমাট ছিল। আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত জোড়া গোলে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে নেয় নরওয়ে। একদম শেষ মুহূর্তে যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও তা কেবল ব্যবধানই কমাতে পেরেছে, ব্রাজিলের বিদায় আটকাতে পারেনি। এর আগে প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারায়েসের একটি পেনাল্টি মিসও ব্রাজিলকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আনচেলত্তি জানান, প্রথম পেনাল্টি নেওয়ার জন্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাফিনিয়াই সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল। এরপরের পছন্দ ছিলেন নেইমার, ব্রুনো এবং মার্তিনেল্লি। সেই হিসাব থেকেই ওই পরিস্থিতিতে ব্রুনোকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ কোচের চোখে সে-ও অন্যতম সেরা বিকল্প ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি যখন কথা বলতে শুরু করেন, তখন তার প্রতিটি শব্দে মিশে ছিল এক বুক বেদনা। তবে দুই মাস আগেই চার বছরের নতুন চুক্তিতে সই করা এই মাস্টারমাইন্ড দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পাত্র নন। সমর্থকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলব, আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব এবং নতুন নতুন ধারণা খুঁজে বের করব।’

হারের তিক্ততা মেনে নিয়ে আনচেলত্তি অকপটে স্বীকার করেন যে, ফলাফলটি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং দলের সবাই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। তবে নিজের শিষ্যদের আগলে রেখে তিনি বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ একটি দল। আমি আমার খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানাই, তারা কঠোর পরিশ্রম করেছে। আমার মনে হয় না আমরা হারার যোগ্য ছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে।’

ফুটবলের এই নিষ্ঠুর নিয়মকে মেনে নিয়ে তিনি যোগ করেন, "এটাই ফুটবল, এটাই খেলাধুলা। কখনও-কখনও পরাজয়ের দুঃখ আর তিক্ততা মেনে নিতে হয়। আমি এমন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত। তবে এই হারকেই আমরা নতুন চক্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করব।’ সমর্থকদের মতোই তারা গভীরভাবে হতাশ উল্লেখ করে আনচেলত্তি জানান, এখন তাদের সঠিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

এই বিদায়ের হাত ধরেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে একটা যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন নেইমার। গুঞ্জন রয়েছে, কাসেমিরো এবং ফাবিনিয়োও হয়তো খুব শীঘ্রই জাতীয় দলকে বিদায় জানাবেন। এই তারকাদের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি যে মাঝমাঠেই হবে, তা বেশ ভালো করেই জানেন সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ কোচ।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে আনচেলত্তি পরিষ্কার করে বলেন, ‘এখন আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। এটা পরিষ্কার যে মাঝমাঠে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের তরুণ প্রতিভা দরকার। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নতুন কিছু উচ্চমানের খেলোয়াড় উঠে আসা দরকার।’

বড় তারকাদের বিদায়ের পর দল যেন খেই হারিয়ে না ফেলে, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে কোচ শেষ করেন এই বলে যে, এই জাতীয় দলে এখনো অনেক শক্তিশালী খেলোয়াড় আছে। তারা তো থাকবেই, পাশাপাশি আগামী দিনে নতুন খেলোয়াড়রাও দলে যোগ দেবে। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই আনচেলত্তি এখন স্বপ্ন দেখছেন সেলেসাওদের নিয়ে এক নতুন সোনালী চক্র শুরু করার।