চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল পর্যন্ত জেলার অন্তত সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়।
এসব উপজেলায় তলিয়ে গেছে বসতঘর, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে কয়েকগুণ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। বন্যা কবলিত এলাকায় জেলা প্রশাসনের ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
বন্যায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা এখন বাঁশখালী। বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে উপজেলার ছনুয়া, শেখেরখীল, চাম্বল, বৈলছড়ি, গণ্ডামারা, সরলসহ উপকূলীয় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বসতবাড়ির ভেতরে কোমর থেকে বুকসমান পানি জমেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে এক লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন।
খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়েছে।
বন্যার পানিতে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক ৪ থেকে ১০ ফুট পানির নিচে থাকায় নৌকাই এখন অনেক এলাকার একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
পাহাড়ি ঢলে শত শত মাছের ঘের, পুকুর ও সবজি ক্ষেত ভেসে গেছে। স্থানীয় মৎস্য ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুক্রবার সকালেই চট্টগ্রামে পৌঁছে বাঁশখালীর বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত সরকারি সহায়তা আরো বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনও ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।
রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ধসের শঙ্কা রাঙ্গুনিয়াসহ চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার কয়েকটি স্থানে দেয়াল ধস ও মাটি চাপায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তায়- চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ৯ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশেষভাবে বাঁশখালীসহ কয়েকটি এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় চরম দুর্ভোগ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। ডলু ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্কও ব্যাহত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, “অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।”
তিনি বলেন, “উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় সরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।”








