সকালে নৌকায় নদী পার হয়ে হরিণচড়া মাঝের চরে নেওয়া হলো একটি বুকশেলফ। এরপর ঘোড়ার গাড়িতে করে সেটি পৌঁছাল আলোর পাঠশালার ঘরে। ঘরের ভেতরে বুকশেলফটি স্থাপন করে একে একে সাজানো হলো বই। তাকজুড়ে বই দেখে শিশুদের চোখেমুখে ফুটে উঠল কৌতূহল। কেউ মলাট দেখছে, কেউ রঙিন ছবির পাতা উল্টে দেখছে। তাদের জন্য তৈরি হলো বই পড়ার নতুন এক জায়গা ‘আলোর লাইব্রেরি’।
লালমনিরহাটের হরিণচড়া মাঝের চরে এক বছর ধরে শিশুদের নিয়ে কাজ করছে রংপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে পরিচালিত ‘আলোর পাঠশালা’। পাঠশালার এক বছর পূর্তি ও প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শিশুদের পড়ার সুযোগ বাড়াতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই লাইব্রেরি। প্রাথমিকভাবে ২০০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে এর। পূজার ছুটির পর ধীরে ধীরে বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
লাইব্রেরিতে রয়েছে শিশুদের উপযোগী নানা ধরনের গল্পের বই, কার্টুন বই, শিশুতোষ উপন্যাস, কিশোর উপন্যাস এবং বড়দের পড়ার মতো বিভিন্ন উপন্যাস। মীনা-রাজুর গল্প, ‘মিনার ঘোড়া আকাশে ওড়ে’ এবং বাঘ-শিয়ালের গল্পের মতো বই শিশুদের আকর্ষণ করবে। পাশাপাশি রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ‘বোতল ভূত’, জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস, আনিসুল হকের ‘কখনো আমার মাকে’সহ বিভিন্ন লেখকের বই। শিশুদের পাশাপাশি যাঁরা অল্পস্বল্প পড়তে পারেন, তাঁরাও এখানে এসে বই পড়ার সুযোগ পাবেন। ফলে লাইব্রেরিটি শুধু শিশুদের জন্য নয়, চরের বড়দেরও বইয়ের কাছে আসার একটি জায়গা হয়ে উঠবে।

বন্ধুসভার বন্ধু, উপদেষ্টা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বইগুলো। বই সংগ্রহ থেকে শুরু করে বুকশেলফ চরে পৌঁছে দেওয়া, লাইব্রেরি সাজানো এবং শিশুদের নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা, সব মিলিয়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করেছেন বন্ধুসভার বন্ধুরা।
নদীবেষ্টিত চরের মানুষের জীবন নানা সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। নদী পারাপারের অসুবিধা, যোগাযোগের সংকট এবং নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো বাস্তবতার মধ্যে শিশুদের নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করা সহজ নয়। অনেক শিশুর জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিবেশে আলোর পাঠশালা শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করেছে। নতুন লাইব্রেরি তাদের শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করবে বলে আশা করছেন অভিভাবকেরা।
চরে পৌঁছেই শিশুদের ক্লাস নেন রংপুর বন্ধুসভার সভাপতি সোহেলী চৌধুরী। তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিশুদের মীনা-রাজুর গল্প শোনান তিনি। এরপর গত এক বছরে তারা কী শিখেছে, তা যাচাই করেন। বাংলা বর্ণমালা, ইংরেজি অক্ষরসহ প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন। শিশুরাও উত্তর দেয়। তাদের শেখার অগ্রগতি যাচাইয়ের পাশাপাশি উৎসাহ দেওয়ার এই আয়োজন যেন এক বছরের পথচলাকে ফিরে দেখারও সুযোগ।

ক্লাস শেষে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রঙিন পেনসিল ও কাগজ। কেউ আঁকে গাছ, কেউ মাছ, কেউবা ফুল। সাদা কাগজে রঙের আঁচড়ে ফুটে ওঠে তাদের কল্পনার জগৎ। নতুন লাইব্রেরি, গল্পের বই আর আঁকাআঁকির উপকরণ পেয়ে তাদের আনন্দ ছিল চোখে পড়ার মতো। দিন শেষে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বেলুন ও চকলেট। পাশাপাশি অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। পাঠশালার কার্যক্রম কীভাবে আরও ভালো করা যায়, শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ কীভাবে উন্নত করা যায়—আলোচনায় উঠে আসে এসব বিষয়ও।
আলোর পাঠশালায় পড়ে সাজেদা বেগমের দুই সন্তান। আগের দিনের কথা মনে করে তিনি জানান, আগে শিশুরা সারা দিন খেলাধুলা করত, পড়াশোনার তেমন পরিবেশ ছিল না। এখন তাঁর দুই সন্তানই নিয়মিত স্কুলে আসছে। এই পরিবর্তন তাঁকে আশাবাদী করেছে।
মুশফিকুল ইসলামের দুই সন্তানও পড়ে আলোর পাঠশালায়। তাঁর কথায়, আগে নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়ার অসুবিধায় অনেক শিশুর পড়াশোনা হতো না। এখন তারা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। নতুন লাইব্রেরি হওয়ায় শিশুরা বই পড়তে পারবে, শেখার পরিবেশ আরও ভালো হবে। তাঁর প্রত্যাশা, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সন্তানেরা পড়াশোনায় এগিয়ে যাবে।

রত্না বেগমের তিন সন্তান পড়ে পাঠশালায়। লাইব্রেরি দেখে খুশি তিনি। তাঁর আশা, শিশুরা এখান থেকে গল্পের বই পড়বে, নতুন কিছু জানবে। ফজিলা বেগমের ভাবনায় শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে কাগজপত্র পড়তে না পারায় নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, শিশুরা শিক্ষিত হলে ভবিষ্যতে পরিবারের সদস্যদের সহায়তা করতে পারবে, কমবে এমন অসুবিধাও।
রোজিনা আক্তার নিজেও অল্পস্বল্প পড়তে পারেন। লাইব্রেরি দেখে উৎসাহিত হয়েছেন তিনি। মেয়ের সঙ্গে নিজেও নিয়মিত এসে বই পড়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান।
পাঁচ বছরের তাসলিমার আনন্দ অবশ্য একটু অন্য রকম। লাইব্রেরিতে বাঘ-শিয়ালের গল্পের বই আর মীনা-রাজুর বই দেখে সে খুব খুশি। বইয়ের ছবিগুলো তার ভালো লেগেছে। সেগুলো পড়বে বলেও জানায় সে। তাসলিমার এই ছোট্ট আনন্দের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে বইয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরির সম্ভাবনা।

রংপুর বন্ধুসভার সহসভাপতি মামুন হোসেন জানান, চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করছে রংপুর বন্ধুসভা। তিনি বলেন, ‘বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। শিশুরা বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করবে, ভবিষ্যতে দেশের বড় বড় পদে যাবে এবং নিজেদের চরের উন্নয়নে কাজ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
সাবেক সাধারণ সম্পাদক দীপ্ত তালুকদার বলেন, ‘ছোট পরিসরে শুরু হলেও ধীরে ধীরে লাইব্রেরিটিকে বড় করতে চাই। আলোর পাঠশালা ও আলোর লাইব্রেরির মাধ্যমে শিশুরা শিখবে, পড়বে। ভবিষ্যতে তারা নিজেদের চর নিয়ে ভাববে, কাজ করবে। একসময় এই উদ্যোগ চরে আলো ছড়াবে।’
এক দিনেই বদলে যাবে না চরের শিশুদের জীবন। তবে বই হাতে নেওয়ার আগ্রহ, গল্প শোনার আনন্দ আর অক্ষর চিনতে শেখার মধ্য দিয়েই শুরু হতে পারে পরিবর্তন। আজ যে শিশু কাগজে গাছ, মাছ ও ফুল আঁকছে, সে হয়তো একদিন নিজের চারপাশের প্রকৃতি নিয়ে ভাববে। যে শিশু আজ গল্পের বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে, তার সামনে খুলে যেতে পারে নতুন এক জগৎ। হরিণচড়া মাঝের চরে আলোর লাইব্রেরি তাই শুধু বই রাখার জায়গা নয়; এটি শিশুদের স্বপ্ন দেখার, শেখার এবং বড়দেরও বইয়ের কাছে ফিরে আসার একটি ছোট্ট উদ্যোগ। সেই উদ্যোগের আলো কত দূর ছড়াবে, তা নির্ভর করবে এর ধারাবাহিকতা ও সবার সহযোগিতার ওপর।
সাধারণ সম্পাদক, রংপুর বন্ধুসভা








