‘আমি সাজ্জাদ গ্রুপের ডেবিট ইমন। এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা। না হলে এখন থেকে আপনি আর ব্যবসা করতে পারবেন না। আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। বেশি দূর যেতে হবে না- পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন আমি কে। আপনি স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের চেয়ে বড় হননি। দুই দিন টাইম দিচ্ছি। না হলে দুই দিন পর ব্যবসা করছেন দেখি, তাহলে দেখবেন কী কী হয়। চট্টগ্রাম শহরের সব ব্যবসায়ী আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই ব্যবসা করছে।’
এভাবেই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারের এক্সেস রোডে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান (ডিডিএন) প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুনের সঙ্গে কথোপকথন হয় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ডেবিড ইমনের। তার কথা মতো ব্যবসা বন্ধ না করায় ঠিক দুই দিন পর তৃতীয় দিনেই ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপ দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবির জেরে এ হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে ১৫-২০ জনের একটি দল কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে কম্পিউটার, ক্লাসসহ পুরো অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যান তাঁরা। তিন মিনিট ভাঙচুর চালিয়ে অফিস ত্যাগ করেন দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সন্ধ্যায় ডিডিএনের মালিক পক্ষ মামলা দায়ের জন্য নগরের চকবাজার থানায় যান। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি।
ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন বলেন, বিদেশি একটি নম্বর থেকে দুই দিন আগে আমাকে ফোন করে ডেভিড ইমন। ফোনে প্রথমে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বলেন। আর ব্যবসা করলে এককালীন ২ কোটি টাকা ও মাসে ১০ লাখ চাঁদা দিতে বলেন। তার কথা মতো চাঁদা না দেওয়ায় দুই দিন পরই আমাদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ইমন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী।
ডিডিএন’র মালিকের সঙ্গে ৬ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের কথোপকথনে ডেবিট ইমন বলেন, ‘বিগত ১৭-১৮ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসা করেছেন। আর কত করবেন? এখন থেকে আমরা করবো। আপনারা আর ব্যবসা করতে পারবেন না। ৫ আগস্টের পর ৮-১০টা মার্ডার মামলা খেয়ে ঘুরতেছি। আপনারা কয়টি মার্ডার মামলা খেয়েছেন? আর আপনি যদি ব্যবসা করেন তাহলে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবসা করতে হবে। ভাইজান ভালোই ভালোই একটা কথা বলি। আপনি যদি আমাদের সর্ম্পকে না জানেন বেশি দূর যাইতে হবে না। পুলিশ কমিশনারের কাছে জিজ্ঞাসা করলেই হবে।
আর দ্বিতীয় কথা হলো আপনি যদি ব্যবসা করেন, আমাদের সঙ্গে কমিটমেন্ট করে ব্যবসা করেন, সমস্যা নাই। আর না হলে আপনি আর ব্যবসা করিয়েন না। আপনাকে দুই দিন টাইম দিচ্ছি। আপনার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। আমার পোলাইন ব্যবসা করবে। আমরা পুরো চিটাগাং শহরে ব্যবসা করছি। গার্মেন্টস বলেন, ইন্টারনেট বলেন- সব জায়গায় আমার ছেলেরা ব্যবসা করছে। সমন্বয় করলে ব্যবসা করতে পারবেন, না হলে পারবেন না। স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের বাসায় কী হয়েছে দেখেছেন তো?’ গত ১১ জুলাই এভাবেই ফোনে হুমকি দেন ইমন। তিনি বর্তমানে দুবাই বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) হাবিবুর রহমান প্রমাণিক বলেন, আমরা ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও হুমকির অডিও ও ভিডিও সব দেখেছি। পুরো ঘটনা আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। যে বা যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের মামলা করতে পরার্মশ দেওয়া হয়েছে। তারা থানায় মামলা করতে গিয়েছেন। এখনো মামলা রেকর্ড হয়নি, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সোমবার দুপুরে ডিডিএন অফিস কাজ করছিলেন প্রতিষ্ঠানটির একদল কর্মী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একদল তরুণ ও যুবক মুখে মাক্স পরে কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন। তাদের কারো কারো হাতে চাইনিজ কুড়াল ও দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। কুড়াল ও হাতুড়ি দিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে কোপ দিয়ে নষ্ট করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির বলেন, সংঘবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ঢুকে দেশীয় অস্ত্র হাতে অফিসের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর চালিয়ে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, আসবাবপত্রসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি ক্ষতি করেন দুর্বৃত্তরা। কর্মচারীদের বেতনের জন্য আনা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় কর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিস ত্যাগ করতে বাধ্য করেন।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। সেই দাবি পূরণ না করায় পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। খবর পেয়ে সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাবিবুর রহমান এবং চকবাজার থানার ওসি নুর হোসেন মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার পর চকবাজার এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, নগরের বাণিজ্যিক এলাকায় এমন প্রকাশ্য হামলার ঘটনায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
চকবাজার ওসি নুর হোসেন মামুন বলেন, হামলার ঘটনায় কারা জড়িত তাদের শনাক্ত করতে কাজ করছে পুলিশ। জড়িতদের শনাক্ত করেই ও গ্রেপ্তার করা হবে।
এর আগে গত ৯ মে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে এক সাংবাদিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ডেবিট ইমনের বিরুদ্ধে। এছাড়া চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে পরপর দুই দফায় গুলি চালানো হয়। এ ঘটনার পেছনেও ডেবিট ইমনের হাত রয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।
বড় সাজ্জাদের ছোঁয়ায় মোবারক হোসেন যেভাবে ডেবিট ইমন
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে মোবারক হোসেন ওরফে ডেবিট ইমন। এলাকায় তার ছিল সাধারণ জীবনযাপন। কিন্তু শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর পরই চট্টগ্রামে একের পর এক খুনে নাম জড়ায় তার। বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে। ধীরে ধীওে হয়ে ওঠেন সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। দেশ ছেড়ে এখন বসবাস করছেন দুবাই। সেখান থেকেই ফোনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ফোন করে চাঁদাবাজি করছেন। তার কথা মতো চাঁদা না দিলে ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে চলছে গুলি-হামলার ঘটনা।
উখিয়ায় মিয়ানমারে পাচারের আগে ১৩০ বস্তা সার উদ্ধার, যৌথ অভিযানে বিজিবি
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ মোট সাতটি মামলার আসামি। তার কাছে একে ৪৭সহ অন্তত ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অস্ত্র চালানোয়ও দক্ষ। সাজ্জাদ ও ইমনের হয়ে চট্টগ্রামে এখন ৫০ জনের বেশি শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
The post চট্টগ্রামে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা-ভাঙচুর appeared first on ZoomBangla.
