বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় অংশীদার চীন। দেশের বৃহৎ অনেক অবকাঠামো প্রকল্পও নির্মাণ করছে সে দেশের কোম্পানিগুলো। ফলে দেশে চীনের নাগরিকদের উপস্থিতি বেড়েছে। এ জন্য তাঁদের বিশেষায়িত সেবা দিতে চায় ব্যাংকগুলো। ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি ১৪টি ব্যাংক পৃথক ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক চীনে প্রতিনিধি অফিসও খুলেছে।

চায়না ডেস্কে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো চীনের মান্দারিন ভাষা জানা ব্যক্তিদের পাশাপাশি চীনের নাগরিকদের প্রাধান্য দিচ্ছে। চায়না ডেস্কে লেনদেন হয় চীনা মুদ্রায়। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের হিসাব খোলা, প্রকল্প অর্থায়ন, গ্যারান্টি সুবিধা, মাশুল জমাসহ নানা ধরনের ব্যাংকিং সেবা দিয়ে চীনা বিনিয়োগে গতি আনতে ভূমিকা রাখছে ব্যাংকগুলো।

জানা গেছে, সর্বশেষ চায়না ডেস্ক চালু করেছে ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক। এর আগে ১২টি ব্যাংক এ সেবা চালু করে। সেগুলো হলো স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ, এইচএসবিসি বাংলাদেশ, ব্যাংক অব সিলন, হাবিব ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এমটিবি, ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), প্রাইম ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, চায়না ডেস্ক চালু করার ফলে চীনা বিনিয়োগকারী, বাংলাদেশি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে আর্থিক সংযোগ বাড়ছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্য অর্থায়ন, নগদ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, প্রকল্প অর্থায়নসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য

বর্তমানে বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন। দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামোর নির্মাণসামগ্রী; সৌর ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রযুক্তি খাত এবং তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয় চীন থেকে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও ভোগ্যপণ্যের বেশির ভাগ আসে সে দেশ থেকে। দ্বিপক্ষীয় এ বাণিজ্যকে আরও সহজ করতে দেশের ব্যাংকগুলো চীনের ব্যাংক অব চায়না, আইসিবিসি, সিসিবি, এবিসির মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি লেনদেন ও নস্ট্রো হিসাব পরিচালনা করছে।

চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

* চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দুই দেশের মধ্যে ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়।* দেশে চীনের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।* নিয়োগের ক্ষেত্রে চীনের মান্দারিন ভাষা জানা ব্যক্তিরা প্রাধান্য পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার ১০ শতাংশও দেশটিতে রপ্তানি করতে পারে না। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতির মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটি থেকে বিনিয়োগ এলেও তা খুব বেশি নয়। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে তোলা হয়েছে চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালে দেশে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের পর থেকে চীনের ৫টি প্রতিষ্ঠান দেশে ১০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এতে প্রায় ২০ হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আগে শুধু আমদানি হতো। এখন দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য তাদের ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের ব্যাংকগুলো চায়না ডেস্ক খুলছে।

পৃথক সেবা ব্যাংকগুলোর

চীনা ব্যবসায়ীদের সেবা দিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০১৬ সালে ‘চায়না ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ চালু করে, যা ২০২১ সালে আরও জোরদার করা হয়। ব্যাংকটি চীনা নাগরিকদের নিয়োগও দেয়। পাশাপশি চীনের সঙ্গে সিন্ডিকেট অর্থায়নও শুরু করে।

প্রিমিয়ার ব্যাংক ২০১২ সালে এবং এমটিবি ২০১৮ সাল থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য বা এফডিআই হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে চীনা ব্যবসায়ীদের সেবা দিয়ে আসছে। ইস্টার্ন ব্যাংক (ইবিএল) ২০১৯ সালে চীনের গুয়াংজুতে নিজস্ব প্রতিনিধি অফিস ও ২০২৩ সালে চীনাদের জন্য ঢাকায় পৃথক বিজনেস ডেস্ক চালু করে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ২০১৯ সালে চীনা নাগরিকদের জন্য বিশেষ সেবা কাউন্টার চালু করে। প্রাইম ব্যাংকও সে বছর চায়না ডেস্ক চালু করে। একই সময়ে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি বাংলাদেশ–চায়না ডেস্ক খোলে। এ ছাড়া বহুজাতিক হাবিব ব্যাংক ২০২০ সালে, স্থানীয় দ্য সিটি ব্যাংক ২০২২ সালে সেবাটি শুরু করে, যা সম্প্রতি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন ২০২৩ সালে চায়না ও ইউয়ান মুদ্রাকেন্দ্রিক বিশেষ সেবার ব্যবস্থা করে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এমডি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকচীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আগে শুধু আমদানি হতো। এখন দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য তাদের ব্যাংকিং সেবার চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের ব্যাংকগুলো চায়না ডেস্ক খুলছে।

ব্র্যাক ব্যাংক ২০২৪ সালে করপোরেট ব্যাংকিংয়ের আওতায় মান্দারিন জানা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চায়না ডেডিকেটেড ডেস্ক চালু করে। মিডল্যান্ড ব্যাংক ২০২৫ সালে চায়না ডেস্ক খোলে। এ ছাড়া চলতি বছর ওয়ান ব্যাংক ও এনসিসি ব্যাংক চায়না ডেস্ক চালু করে। ইতিমধ্যে ওয়ান ব্যাংক প্রায় দুই কোটি ডলারের লেনদেন করেছে।

এ বিষয়ে ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের গ্লোবাল করিডর কৌশলের অংশ হিসেবে চলতি বছর আমরা চায়না ডেস্ক চালু করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ আরও জোরদার করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমন্বিত ও সহজতর ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।’

মুহিত রহমান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর শিল্প, উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী খাতের বিকাশে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন করেছি। এখন আরও কিছু চীনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে কাজ করছি।’

দেশে চীনের যত কোম্পানি

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্য খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে বড় পরিসরে কাজ করছে বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যাংকগুলোয় হিসাব পরিচালনা করছে। তারা ব্যাংকগুলোয় আমানত রাখছে, বিনিয়োগ আনছে এবং ব্যাংক গ্যারান্টি-সুবিধা নিচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো), পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিভিন্ন প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও প্রকৌশলগত কাজ পরিচালনা করছে বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং, জিয়াংসু ইটার্ন, ফুজিয়ান ইলেকট্রিক পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না ওয়ানবাও ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বিডি, নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল, সানসিংস স্মার্ট ইলেকট্রিক বাংলাদেশ কোম্পানি ও হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি।

বৃহৎ অবকাঠামো, সড়ক, সেতু, রেলওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, চায়না কনস্ট্রাকশন সেভেনথ ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি, সিআরসিসি হারবার, পাওয়ার চায়না হুপেই কনস্ট্রাকশন, চায়না রেলওয়ে ব্রিজ গ্রুপ, জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রেলওয়ে ১৬তম ব্যুরো গ্রুপ করপোরেশন, চায়না শানডং ইন্টারন্যাশনাল, সিনোহাইড্রো, বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ, চায়না শানডং হাই-স্পিড কিয়ানফাং ইন্টারন্যাশনাল টেকনোলজি, পাওয়ার চায়না হারবার কোম্পানি, হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, টিবিইএ কোম্পানি, চায়না হেবেই কনস্ট্রাকশন।

ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে কাজ করছে চীনের বেশ কিছু কোম্পানি। তারা বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক ও বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে অন্যতম হলো সানি ট্রেন্ড (এইচকে) কোম্পানি, জিউনুও (বাংলাদেশ) ম্যাটেরিয়ালস কোম্পানি, হেংচেন জিয়াসেং ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি ও অ্যাডেলিন বিউটি টেকনোলজি (বাংলাদেশ) কোম্পানি।