সামিন ইয়াসার
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের বাজার এখন চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ঠিক এমন সময়ে চীনের বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই তাদের ‘কিমি’ মডেল দিয়ে প্রযুক্তি দুনিয়ায় দারুণ সাড়া ফেলেছে। কম খরচে ও ওপেন-সোর্সে দীর্ঘমেয়াদি কোডিংয়ের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে গত ১২ জুন তারা বাজারে এনেছে ‘কিমি কে২.৭ কোড’। এটি জটিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এআই এজেন্ট হিসেবে অসামান্য দক্ষতার দাবি করছে।
মুনশট এআই ও কিমির চমকপ্রদ যাত্রা
টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের কয়েকজন সাবেক কর্মীর হাত ধরে ২০২৩ সালের মার্চে মুনশট এআইয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে আছেন সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং গবেষক চিলিন ইয়াং। আলিবাবা এবং হংশানের মতো শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় কিমি চ্যাটবট, যার ১ লাখ ২৮ হাজার টোকেনের কনটেক্সট উইন্ডো সেসময় বেশ আলোড়ন তুলেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় কিমি কে২ সিরিজ, কিমি লিনিয়ার, কে২.৫, কে২.৬ এবং সর্বশেষ এই কে২.৭ কোড মডেলটি বাজারে নিয়ে এলো প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন মডেলে যে চমক থাকছে
সাধারণ চ্যাটিংয়ের চেয়ে বরং দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে কিমি কে২.৭ কোড। মূলত কে২.৬ আর্কিটেকচারের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি করা হয়েছে। মডিফায়েড এমআইটি লাইসেন্সের আওতায় মডেলটি হাগিং ফেসে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
লোডশেডিংয়ে কী হতে পারে বিদ্যুতের বিকল্প?
মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো
উন্নত আর্কিটেকচার: এটি একটি মিক্সচার-অব-এক্সপার্টস মডেল, যার মোট প্যারামিটার ১ ট্রিলিয়ন হলেও প্রতি টোকেন প্রসেস করতে মাত্র ৩২ বিলিয়ন প্যারামিটার সক্রিয় থাকে।
এক্সপার্ট সিস্টেম: মডেলটিতে ৩৮৪টি এক্সপার্ট রয়েছে, যার মধ্যে প্রতি টোকেনের জন্য ৮টি নির্বাচিত ও একটি অভিন্ন এক্সপার্ট কাজ করে।
বিশাল কনটেক্সট উইন্ডো: এর কনটেক্সট উইন্ডো সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫৬ হাজার টোকেন পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থায়ী চিন্তন মোড: এই মোডটি সব সময় চালু থাকে এবং এটি বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই।
মাল্টিমিডিয়া ইনপুট: ছবি ও ভিডিও ইনপুট প্রসেস করার জন্য এতে ‘মুনভিট’ এনকোডার যুক্ত করা হয়েছে।
সাশ্রয়ী ব্যবহার: আগের কে২.৬ মডেলের তুলনায় এটি প্রায় ৩০ শতাংশ কম রিজনিং টোকেন ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
অভাবনীয় সাশ্রয় ও উন্নত কর্মক্ষমতা
মুনশট এআইয়ের নিজস্ব বেঞ্চমার্ক ‘কিমি কোড বেঞ্চ ভি ২’-এর তথ্য অনুযায়ী, আগের সংস্করণের (কে২.৬) তুলনায় নতুন মডেলটির স্কোর ৫০.৯ থেকে বেড়ে ৬২.০-তে দাঁড়িয়েছে, যা ২১.৮ শতাংশ উন্নতি নির্দেশ করে। এ ছাড়া ‘প্রোগ্রাম বেঞ্চ’-এ ১১.০ শতাংশ এবং ‘এমএলএস বেঞ্চ লাইট’-এ ৩১.৫ শতাংশ উন্নতি দেখা গেছে। এমসিপি টুল ব্যবহারের ক্ষমতা যাচাইয়ে এটি ৮১.১ স্কোর অর্জন করেছে, যা জনপ্রিয় ক্লদ অপাস ৪.৮-এর ৭৬.৪ স্কোরকেও পেছনে ফেলেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার তৈরির কাজে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা ও যাচাইকরণ করতে হয়, যেখানে প্রতিটি ধাপেই রিজনিং খরচ বাড়ে। সেখানে ৩০ শতাংশ রিজনিং টোকেন সাশ্রয় হওয়া মানে বিশাল অঙ্কের অর্থ বেঁচে যাওয়া, যাকে মুনশট বলছে ‘কম অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা’। খরচের দিক থেকে প্রতি মিলিয়ন ইনপুট টোকেনে এর মূল্য মাত্র ০.৯৫ ডলার এবং আউটপুটে ৪.০০ ডলার। যেখানে ক্লদ অপাস ৪.৮-এর খরচ ইনপুটে ৫ ডলার এবং আউটপুটে ২৫ ডলার। অর্থাৎ ইনপুটের ক্ষেত্রে প্রায় ৫ গুণ এবং আউটপুটে ৬ থেকে ৭ গুণ পর্যন্ত সাশ্রয়ী এই কিমি কে২.৭ কোড।
আরও পড়ুন
ভিউ বাড়াতে কখন পোস্ট করবেন জানুন আজই
প্রতিযোগিতায় কিমির অবস্থান
সাশ্রয়ী ও উন্নত হলেও সামগ্রিক সক্ষমতায় কিমি কে২.৭ এখনো ওপেনএআইয়ের ‘জিপিটি-৫.৫’-কে পুরোপুরি ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। কিমি কোড বেঞ্চ ভি ২-তে জিপিটি-৫.৫-এর স্কোর যেখানে ৬৯.০, সেখানে কিমির স্কোর ৬২.০। প্রোগ্রাম বেঞ্চেও জিপিটির ৬৯.১ স্কোরের বিপরীতে কিমির স্কোর ৫৩.৬।
তবে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, কিমির এই ফলাফলগুলো মুনশটের নিজস্ব পরীক্ষায় পাওয়া। এসডব্লিউই-বেঞ্চ ভেরিফায়েড বা লাইভকোডবেঞ্চের মতো তৃতীয় পক্ষের কোনো স্বাধীন বেঞ্চমার্কে ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই বিশ্লেষকরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ডেভেলপারদের নিজস্ব কর্মপ্রবাহে এটি পরীক্ষা করে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কেন এ অগ্রগতি এত গুরুত্বপূর্ণ
মুনশট সাধারণ কথোপকথনের জন্য তাদের বৃহত্তর মডেল কে২.৬ ব্যবহারেরই পরামর্শ দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো জটিল কাজের জন্য কে২.৭ কোড মডেলটি বিশেষভাবে সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি কিমি এপিআই, কিমি কোড সিএলআই এবং হাগিং ফেসে ওপেন ওয়েটসহ পাওয়া যাচ্ছে; ফলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান সহজেই নিজেদের সার্ভারে এটি স্থাপন করতে পারবে।
ওপেন-সোর্স মডেলের জগতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। কম খরচে, উন্মুক্ত সোর্সে এমন শক্তিশালী মডেল বাজারে আসায় ছোট প্রতিষ্ঠান ও ফ্রিল্যান্স ডেভেলপাররা দারুণভাবে লাভবান হবেন। তবে স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই না হওয়া পর্যন্ত এবং কেবল বিক্রেতা-প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর নির্ভর করার বিষয়ে সতর্ক থাকাও জরুরি। সামনের মাসগুলোতে স্বাধীন বেঞ্চমার্ক ফলাফল প্রকাশের পরই বাস্তব প্রয়োগে মডেলটির আসল সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আরও পড়ুন
ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা পেতে গুগলের অ্যালার্ট চালু করবেন যেভাবে
তথ্যসূত্র: মুনশট এআই-এর অফিসিয়াল ব্লগ ও এপিআই ডকুমেন্টেশন, হাগিং ফেস মডেল কার্ড এবং প্রযুক্তি সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিবেদন (জুন, ২০২৬)।
লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।
এসইউ








