ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন ও বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনায় নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক নথি সরিয়ে ফেলা ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফর্ম। মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষক নেটওয়ার্ক এসব দাবি জানায়।
সংস্কারের পর গত রোববার ডাকসু সংগ্রহশালাটি আবার চালু করা হয়। সংগ্রহশালায় নতুন করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া জিন্নাহর সেই ভাষণের ছবি, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি, ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের কাটিং এবং ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি স্থান পায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে থাকা একক বা ঐতিহাসিক কোনো ছবি রাখা হয়নি।
জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার ঘটনাকে ‘মব’ উল্লেখ করে বিচার দাবি করলেন ডাকসু নেতারাশিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদল সরাসরি ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করে এসব পরিবর্তনের সত্যতা পেয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক নন; বরং তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে বর্বর গণহত্যা চালায়, সে জন্য তারা কখনোই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি। এমন একটি রাষ্ট্রের বিতর্কিত শাসকের ছবি যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও সংগ্রামের স্মারকে স্থান পাওয়া বাঙালি জাতির জন্য চরম অবমাননাকর।
‘ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা’
শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও জাতীয় মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনের ‘প্রধানতম নেপথ্য রূপকার’ উল্লেখ করে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, যেকোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতোই তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তবে পতিত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেত্রী ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ওপর ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আগের ইতিহাসের গুরুত্ব মুছে দিতেই এই ছবি সরানো হয়েছে। এটি কেবল অসংবেদনশীলতাই নয়, বরং ইতিহাস থেকে মূল নায়কদের মুছে ফেলার এক নিকৃষ্ট ও পরিকল্পিত অপচেষ্টা।
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, আর কী যুক্ত হলো, কী বাদ গেলবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে এবং এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের (রাজাকার ও আলবদর) চালানো নৃশংস গণহত্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। সংগ্রহশালা থেকে এসব আলোকচিত্র বা নথি সরিয়ে ফেলাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিরোধী নির্দিষ্ট উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না।
ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেললেন এক শিক্ষার্থী‘নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি’
ডাকসু সংগ্রহশালাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আকর উল্লেখ করে শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এখানে যেকোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্বানুমতি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ছাত্র সংসদের নেতাদের খেয়ালখুশিমতো বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মর্জিতে বা উগ্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় শিক্ষক নেটওয়ার্ক তিন দফা দাবি জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষকেরা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলা স্মারকগুলো পুনর্বহাল এবং সেগুলোর তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফর্ম।
পদদলিত করতে ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি







