গ্রুপ পর্বে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে ইতিহাস গড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডা। এবার সেই অর্জনকে আরও বড় করার পালা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল, যেখানে একটি জয়ই নিশ্চিত করবে শেষ ষোলোর টিকিট, আর একটি হার শেষ করে দেবে স্বপ্নের যাত্রা। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে ৯০ মিনিটের লড়াইই ঠিক করে দেবে কার বিশ্বকাপ অভিযান চলবে, আর কার শেষ হবে।

খেলাটি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী রোববার দিবাগত রাত ১টায় অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপের নক আউট স্টেজের এই প্রথম ম্যাচে কে কার চেয়ে কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে? গ্রুপ পর্বের ম্যাচে কে কতটুকু শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়ে এসেছে? চলুন দেখে নেওয়া যাক।

‘বি’ গ্রুপ থেকে কানাডা ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার আপ হিসেবে শেষ-৩২ এর লড়াইয়ে মাঠে নামবে। কানাডার আক্রমণভাগ গ্রুপ পর্বে ম্যাচভেদে ভিন্ন চিত্র উপহার দিয়েছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে তারা ১৩টি শট নেয়, যার ৪টি ছিল অন-টার্গেট। প্রতিপক্ষের বক্সে ৩৭টি টাচ থাকলেও তারা ২টি বড় সুযোগ নষ্ট করে। ২১ মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর ৭৮ মিনিটে বদলি কাইল লারিনের গোলে সমতায় ফেরে দলটি।

কাতারের বিপক্ষে কানাডার আক্রমণ ছিল বিধ্বংসী। প্রত্যাশিত গোল ৪.৬০, প্রতিপক্ষের বক্সে ৯৭টি টাচ এবং ৩২টি শটের মধ্যে ১০টি অন-টার্গেট ছিল। জোনাথন ডেভিড হ্যাটট্রিক করেন, আর কাইল লারিন ও নাথান সালিবা একটি করে গোল যোগ করেন।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমার্ধে কানাডার আক্রমণভাগ ছিল নিষ্প্রভ। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ২ গোল হজমের পর তারা আক্রমণের গতি বাড়ায়। বদলি প্রমিজ ডেভিড মাঠে নেমেই একটি গোল করে ব্যবধান কমালেও আর গোল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত হার নিয়েই মাঠ ছাড়ে কানাডা।

কানাডার মিডফিল্ড গ্রুপ পর্বে দুই ম্যাচে দারুণ আধিপত্য দেখালেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে চাপে পড়ে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে তারা ৬১% বল দখলে রেখে ৪২১টি পাসের মধ্যে ৩১০টি (৭৪%) সফল করে, যার ১৮৩টি ছিল প্রতিপক্ষের অর্ধে। তবে ক্রসের সফলতার হার ছিল মাত্র ২১%।

কাতারের বিপক্ষে কানাডার মাঝমাঠ পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। ৭৯% বল দখলের পাশাপাশি তারা ৫৬৭টি পাসের মধ্যে ৫১৫টি (৯১%) সফল করে, যার ৪৪২টি ছিল প্রতিপক্ষের অর্ধে।

সুইজারল্যান্ডের হাই-প্রেসিংয়ের সামনে প্রথমার্ধে কানাডার মিডফিল্ড পাসিংয়ে তাড়াহুড়ো ও ভুলের কারণে ছন্দ হারায়, ফলে আক্রমণভাগে বলের জোগান ব্যাহত হয়। তবে শেষ ৩০ মিনিটে তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ভালো বিল্ড-আপ তৈরি করতে সক্ষম হয়।

কানাডার রক্ষণভাগ গ্রুপ পর্বে বৈচিত্র্যপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে তারা গ্রাউন্ড ডুয়েলে ৫৮% জয় পেলেও এরিয়াল ডুয়েলে সফলতা ছিল মাত্র ৩৩%। ২১ মিনিটে লুকিচের গোল ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষকে মাত্র ৩টি অন-টার্গেট শটেই সীমাবদ্ধ রাখে।

কাতারের বিপক্ষে কানাডার ডিফেন্সকে তেমন কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি। কাতার পুরো ম্যাচে মাত্র ২টি শট নেয়, যার একটিও অন-টার্গেট ছিল না। এমনকি প্রতিপক্ষের বক্সে তাদের টাচ ছিল মাত্র ১টি, ফলে কানাডা অনায়াসেই ক্লিনশিট ধরে রাখে।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আলফোনসো ডেভিসের অনুপস্থিতিতে কানাডার রক্ষণভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ৪৬ মিনিটে রুবেন ভারগাস এবং ৫৭ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে জোহান মানজাম্বি গোল করেন। ম্যাচ শেষে কোচ জেসি মার্শও স্বীকার করেন, বিরতির পর পাঁচজনের ডিফেন্সে না ফেরাই রক্ষণভাগের জন্য বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ গ্রুপের রানার আপ হিসেবে পরের রাউন্ডে যাচ্ছে। শুরুতে হোঁচট খেলেও শেষের দিকে এসে ঘুরে দাঁড়ায় হুগো ব্রুসের শিষ্যরা। দক্ষিণ আফ্রিকার আক্রমণভাগে গ্রুপ পর্বজুড়ে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। মেক্সিকোর বিপক্ষে তারা পুরো ম্যাচে মাত্র ৩টি শট নেয়, প্রত্যাশিত গোল ছিল মাত্র ০.০৭ এবং প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শ করে মাত্র ২ বার।

চেকিয়ার বিপক্ষে অবশ্য আক্রমণে উন্নতি দেখা যায়। তারা ১৭টি শট নেয়, যার ৪টি ছিল লক্ষ্যে এবং প্রত্যাশিত গোল বেড়ে দাঁড়ায় ১.৩৮-এ। তবে ওপেন প্লে বা মাঠের খেলা থেকে গোল করার দুর্বলতা থেকেই যায়। একমাত্র গোলটি আসে পেনাল্টি থেকে, আর ১৭টি শটের মধ্যে ১১টিই ছিল বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয়ের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার আক্রমণভাগ সবচেয়ে কার্যকর ছিল। তারা ১৩টি শট নেয়, যার ৪টি অন-টার্গেট এবং ৪টি ব্লক হয়। দলের মোট প্রত্যাশিত গোল ছিল ১.১৬, যার মধ্যে ওপেন প্লে থেকে ১.০৪। এই ম্যাচে তারা একটি বড় সুযোগ তৈরি করে। ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে মাসেকোর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে জয়সূচক গোলটি আসে। তবে এই ম্যাচেও দূরপাল্লার শটের প্রবণতা ছিল, ১৩টির মধ্যে ৮টিই নেওয়া হয় বক্সের বাইরে থেকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডের পারফরম্যান্স ম্যাচভেদে বল পজেশনের ওপর নির্ভর করেছে। মেক্সিকোর হাই-প্রেসিংয়ের বিপক্ষে তারা মাত্র ৪০% বল দখলে রাখতে পারে। পাসিংয়ের নির্ভুলতা ছিল ৮১%, সফল পাস ২৭২টি। লং বল ও ক্রসের সফলতাও ছিল হতাশাজনক।

চেকিয়ার বিপক্ষে চিত্র পাল্টে যায়। ৬২% বল দখলে রেখে তারা ৯০% নির্ভুলতায় ৫০৮টি সফল পাস খেলে এবং লং বলের সফলতার হার বেড়ে ৫২%-এ পৌঁছায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা বল দখলের বদলে রক্ষণাত্মক ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং কৌশল বেছে নেয়। ফলে বল পজেশন নেমে আসে ৩২%-এ। তারা ৮১% নির্ভুলতায় ২৭৭টি সফল পাস দেয়, প্রতিপক্ষের অর্ধে সম্পন্ন করে ১০৩টি পাস। লং বলের সফলতার হার ছিল ৩৩% (১৯টি সফল) এবং ক্রসের সফলতা ১৩%। বলের দখল কম থাকলেও কৌশলগতভাবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামাল দিতে তারা সফল ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগে গ্রুপ পর্বে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে তারা শারীরিক ও এরিয়াল ডুয়েলে পিছিয়ে ছিল। মাত্র ৩২% এরিয়াল ডুয়েল জয়ের পাশাপাশি গ্রাউন্ড ডুয়েলেও দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট, যার ফল ২-০ গোলের হার।

চেকিয়ার বিপক্ষে ১-১ ড্র করলেও রক্ষণভাগ প্রতিপক্ষকে ৩টি বড় সুযোগ তৈরি করতে দেয়। ডিফেন্ডাররা মেক্সিকোর বিপক্ষে ১৭টি ও চেকিয়ার বিপক্ষে ২৪টি ক্লিয়ারেন্স এবং একাধিক ট্যাকল করে দলকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে ডি-বক্সে পজিশনিং ও এরিয়াল ডুয়েলে দুর্বলতা (৪১% সফলতা) উদ্বেগের কারণ ছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ অসাধারণ পারফরম্যান্স উপহার দেয়। কোরিয়ার ৬৮% বল দখল, ১৮ বার বক্সে প্রবেশ ও ৮টি শটের বিপরীতে তারা মাত্র ৩টি অন-টার্গেট রাখতে দেয়। ডিফেন্ডাররা ৪০টি ক্লিয়ারেন্স, ১৫টি ইন্টারসেপশন, ২টি ব্লক ও ১১টি সফল ট্যাকল করে ক্লিনশিট নিশ্চিত করেন।

এরিয়াল ডুয়েলে কিছু দুর্বলতা থাকলেও গ্রাউন্ড ডুয়েলে তারা ৫১% জয় পায়। গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ক্লিনশিট রাখেন। ডিফেন্সে খুলিসো মুদাউ এই ম্যাচে অসাধারণ পারফর্ম্যান্স দেখান।

সব মিলিয়ে পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচটি একপেশে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, যদিও আক্রমণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং এরিয়াল ডুয়েলে দুর্বলতা তাদের চিন্তার কারণ।

অন্যদিকে কানাডা আক্রমণে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে থাকলেও, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চাপে তাদের রক্ষণভাগে ভাঙনের চিত্রও দেখা গেছে। ফলে লস অ্যাঞ্জেলেসে শেষ ষোলোর টিকিটের এই লড়াইয়ে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ছোট ছোট মুহূর্ত-একটি ভুল, একটি সফল কাউন্টার কিংবা কোনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্য।

যে দল নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে এবং দুর্বলতাগুলো আড়াল করতে পারবে, তারাই ইতিহাস গড়ে জায়গা করে নেবে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে।

আরএএইচইউএল/আইএইচএস/