রাজধানীর তিনটি সরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ১২ জন দালালকে আটক করার জন্য র্যাবকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। অবশ্যই এটা একটা বলার মতো কাজ হয়েছে। দালালদের দোর্দণ্ডপ্রতাপে সরকারি হাসপাতালগুলোর যে নাজেহাল অবস্থা, সেটা কোনো নতুন খবর নয়। যাঁরাই সরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েছেন, তাঁরাই জানেন কী ধরনের পরিবেশ। কখন কোথা থেকে কীভাবে কোনো দালাল এসে পরিস্থিতি একেবারে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, সেটা যিনি দেখেছেন, তিনিই শুধু উপলব্ধি করতে পারেন। সুতরাং র্যাবের অভিযানের ফলে দালালেরা আটক হওয়ায় রোগীরা কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি থেকে বের হতে পারবেন।
দালালদের নিয়ে জানা গল্পটি হলো, সরকারি হাসপাতালে আসা রোগী এবং তাঁর স্বজনদের কাছে এসে দালালেরা জানায়, দ্রুততম সময়ে এবং উন্নত চিকিৎসা পেতে চাইলে এই হাসপাতালে বসে থাকলে চলবে না। যেতে হবে বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে আছেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা। একবার সেখানে যেতে পারলেই রোগমুক্তির আশা শতভাগ। এ ধরনের প্রলোভনে বিচলিত হয়ে যাঁরা বেসরকারি হাসপাতালে যান, তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটে, তা নিয়েও পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তবে মুশকিল হলো, দালালদের এসব ‘কীর্তি’র খবর প্রকাশিত হলেও সাধারণ মানুষ তা আমলে নিতে চায় না। প্রবল বিশ্বাসের সঙ্গে তারা দালালদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন হলো, মাত্র ১২ জন দালালকে ধরে শাস্তি দিলেই কি দালালদের এই ব্যবসা লাটে উঠবে? সাধারণ মানুষ কি এর পর থেকে সরল বিশ্বাসের কারণে এই প্রতারণায় ফাঁদে আর পা দেবে না?
প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে, সরকারি হাসপাতালগুলো আদতেই দালালমুক্ত হতে পারবে কি না। দালালেরা যে হিমশৈল বা আইসবার্গের উপরি অংশমাত্র, সে কথাও সংশ্লিষ্ট সবার জানা। কীভাবে এই দালালশ্রেণি অবাধে হাসপাতাল এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, সেটা নিশ্চয় খোঁজ নিলে জানা যাবে। দালালেরা সরকারি হাসপাতাল থেকে যে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে যায়, সেই হাসপাতালের মালিক কে, কোন চিকিৎসকেরা সেসব হাসপাতালে কাজ করেন, দালালদের কারা পরিচালনা করেন, কাদের কাছ থেকে তারা পয়সা পায়? রোগীর পকেট কাটা এই গোষ্ঠীর মধ্যে কারা কারা যুক্ত আছে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দালাল ব্যবসা ঠেকাতে পারেন না কেন? শর্ষের মধ্যে ভূত আছে কি না, সেটাও তো দেখা দরকার।
সে কারণে র্যাবের এই ভালো উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও পরবর্তীকালে সরকারি হাসপাতালগুলো একেবারে দালালমুক্ত হয়ে যাবে—এ রকম বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। শুধু দালালদের মাঝে মাঝে আটক করে জেল-জরিমানা করা হলেই এরা হাসপাতাল এলাকা থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা কঠিন। এদের শিকড় কোথায়, তা জানার পর যদি ওপর মহলের চাপে রহস্যটা চেপে যাওয়া হয়, তাহলে যেই লাউ, সেই কদুই হবে। কাজের কাজ আর কিছুই হবে না।
আমরা চাইব, দালাল চক্র সমূলে উচ্ছেদ হোক। সেটা সহজ কাজ নয় জেনেও আন্তরিকতার সঙ্গে দালালদের প্রতিরোধ করার জন্য সবাই সচেতন হোক, এটাই কাম্য।







