ছোটদের পাঠ্যবইয়ে একটি চমৎকার ছড়া আছে। অতি জনপ্রিয় সেই ছড়ার নাম ‘আমি খোকা’। ছড়াটি এমন—

‘ওখানে কে রে?

আমি খোকা।

মাথায় কী রে?

আমের ঝাঁকা।

খাসনে কেন?

দাঁতে পোকা।’

দাঁতে কি আসলে পোকা হয়? বিজ্ঞান কী বলে? বিজ্ঞানের কথা বাদ দিন। দাঁতের পোকা কেউ কি কখনো দেখেছেন? না, দেখেননি। বেশির ভাগ মানুষই দেখেননি। কিন্তু কিছু মানুষ দেখার দাবি করেন।

মানসুরা বেগমের কথাই ধরা যাক। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে দাঁতের ব্যথায় ভুগছেন। দাঁতে লবঙ্গ-আদা কত কিছুই দিয়েছেন। এমনকি দাঁতব্যথার ওষুধও খেয়েছেন। কিছুদিন ভালো থাকেন। তারপর আবার যা তা-ই। প্রবল যন্ত্রণা নিয়ে ব্যথা ফিরে আসে। তখন পাশের বাড়ির জরিনা বেগম পরামর্শ দেন যামিনি কবিরাজের কাছে যেতে। তিনি নাকি তুকতাক করে দাঁতের পোকা বের করে দেন!

মানসুরা বেগম ছোটেন যামিনি কবিরাজের কাছে। তিনি দাঁত দেখে বলেন, পোকা গিজগিজ করছে! পরদিন খুব ভোরে আবার যেতে হবে।

মানসুরা বেগম পরদিন ভোরে আবার ছোটেন যামিনি কবিরাজের কাছে। সারা রাত ব্যথা সহ্য করা কঠিন ছিল বলে তিনি ব্যথার ওষুধও খান। তবে পরদিন দাঁতের ব্যথা থেকে চিরমুক্তির আশায় মনে মনে তিনি আনন্দিত।

ঝকঝকে সাদা দাঁত মানেই কি সুস্থ দাঁত
মানসুরা বেগমের কথাই ধরা যাক। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে দাঁতের ব্যথায় ভুগছেন। দাঁতে লবঙ্গ-আদা কত কিছুই দিয়েছেন। এমনকি দাঁতব্যথার ওষুধও খেয়েছেন। কিছুদিন ভালো থাকেন।

কবিরাজ সবকিছু ঠিক করেই রেখেছিলেন। মানসুরা বেগমকে দেখে একগাল হেসে বলেন, ‘এসো মা, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।’

মানসুরা বেগমকে যত্ন করে মাটির ঘরের দাওয়ায় বসানো হয়। তারপর একটি হলুদ রঙের কচুর ডাঁটা আর একমুঠো পরিষ্কার তুলা ঘর থেকে নিয়ে আসেন কবিরাজ। মানসুরা বেগমকে বলেন, ‘এবার হাঁ করো তো মা!’ মানসুরা বেগম হাঁ করলেন। যামিনি কবিরাজ দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব মন্ত্রতন্ত্র পড়েন। তারপর কচুর ডাঁটা আক্রান্ত দাঁতে বারবার আলতো করে বোলাতে থাকেন।

মিনিট পাঁচেক চলে মন্ত্রপাঠ আর ডাঁটা বোলানো। এরপর পরিষ্কার তুলাটা নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখান মানসুরা বেগমকে। তিনি নেড়েচেড়ে দেখেন, আসলেই তাতে কিছু নেই। কবিরাজ এবার তুলা আক্রান্ত দাঁতে রেখে বলেন, ‘হালকা কামড় দিয়ে চেপে ধরো মা।’

মানসুরা বেগম কবিরাজের নির্দেশ পালন করেন। মিনিট পাঁচেক আক্রান্ত দাঁতের ওপর রেখে দেন তুলাটা। তারপর কবিরাজ দাঁত থেকে তুলাটা বের করে নিয়ে আসেন। খুশিতে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলেন, ‘দেখো মা, কতগুলো পোকা ছিল তোমার দাঁতে!’

মানসুরা বেগম তাজ্জব! সরু চালের মতো সাদা সাদা শুঁয়োপোকা কিলবিল করছে তুলার ওপরে! তিন-চার মিলিমিটারের ছোট্ট ছোট্ট কীট। সাদা ধবধবে। শিগগিরই তাঁর বিস্ময় খুশিতে রূপ নেয়। যাক, তাহলে পোকার হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেল!

দাঁতে পোকা ধরে কেন
মানসুরা বেগমকে বলেন, ‘এবার হাঁ করো তো মা!’ মানসুরা বেগম হাঁ করলেন। যামিনি কবিরাজ দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব মন্ত্রতন্ত্র পড়েন। তারপর কচুর ডাঁটা আক্রান্ত দাঁতে বারবার আলতো করে বোলাতে থাকেন।

মানসুরা বেগম হাসিমুখে বলেন, ‘কাকা, আপনার ফি!’

‘এ কী কথা বলো মা জননী!’ বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বলেন কবিরাজ, ‘ওসব ফি-টি নেওয়া গুরুর নিষেধ! ফি নেই, তবে হাদিয়া আছে। ৫১ টাকা। এটাই নিয়ম। এরপর তোমার যা ইচ্ছা।’

মানসুরা বেগম হাদিয়ার ৫১ টাকার সঙ্গে আরও ৫০ টাকা দেন কবিরাজকে। টাকার অভাব তাঁর নেই। টাকা খরচ হলেও ক্ষতি নেই, ব্যথা থেকে মুক্তি চান তিনি। কবিরাজ খুশি হয়ে মানসুরা বেগমকে দোয়া করেন। বলেন, সকাল-বিকাল লবঙ্গ মেশানো গরম পানি দিয়ে কুলি করতে।

মানসুরা বেগম খুশি মনে ফিরে আসেন। ব্যথাও কমে যায়। কিন্তু পাঁচ দিন পর আবার ব্যথা শুরু হয়। এখন কী করবেন? ভাবেন, পোকা হয়তো সব বের হয়নি, ক্ষতের ভেতর কিছু রয়ে গেছে। আবার ছোটেন কবিরাজের কাছে। কবিরাজ দাঁত দেখে বলেন, ‘পোকার বীজ কিছু থেকে গিয়েছিল। সেগুলো থেকে নতুন পোকা জন্মেছে।’ আগের মতো করে আবার পোকা বের করে দেন কবিরাজ। তবে এবার আর হাদিয়া নেন না। বলেন, ‘দুশ্চিন্তা কোরো না মা। আর পোকা হবে না।’

মানসুরা বেগম ফিরে আসেন। কিন্তু এবার আর আগের মতো খুশি নন। দুদিন পর আবার ফিরে আসে দাঁতব্যথা। মনে মনে বলেন, ‘যামিনি কবিরাজ একটা ঠগ-মিথ্যুক।’ তারপর দাঁতের চিকিৎসকের কাছে গিয়ে দাঁতটা ফেলেই দেন। ব্যথা থেকে এবার চিরমুক্তি মেলে তাঁর।

দাঁত কেন হাড় নয়
কবিরাজ দাঁত দেখে বলেন, ‘পোকার বীজ কিছু থেকে গিয়েছিল। সেগুলো থেকে নতুন পোকা জন্মেছে।’ আগের মতো করে আবার পোকা বের করে দেন কবিরাজ। তবে এবার আর হাদিয়া নেন না।

কবিরাজের কারসাজির পেছনের বিজ্ঞান

যামিনি কবিরাজ যে উপায়ে দাঁতের পোকা বের করলেন, আসলেই কি ওভাবে পোকা বের করা সম্ভব? অত বড় বড় পোকা কি দাঁতের ভেতর নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারে? দাঁতে পোকা হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। পোকাই যদি হতো, খুব সহজেই সেই পোকা দমন করা যেত। তাহলে দাঁতে পোকার কথা বলা হয় কেন?

কথাটা অনেকটা প্রচলিত বাগধারার মতো। আর এর পেছনে বড় কারণ যামিনির মতো কিছু কবিরাজের কারসাজি। আগে এ দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দাঁতের উন্নত চিকিৎসা ছিল না। তাই সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে কবিরাজের দ্বারস্থ হতেন। কবিরাজ গ্রামের মানুষকে বিশ্বাস করাতেন যে দাঁতে পোকা হয়।

কবিরাজ যখন দাঁত থেকে পোকা বের করেন, তাঁর হাতে কচুর ডাঁটা বা এ-জাতীয় কিছু থাকে। আর থাকে পরিষ্কার তুলা। যেমনটা আমরা মানসুরা বেগমের ক্ষেত্রে দেখেছি। চোখের সামনে এমনভাবে পোকা বের করতে দেখলে বেশির ভাগ রোগীই বিশ্বাস করে বসেন।

বেআক্কেল আক্কেল দাঁত!
আগে এ দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দাঁতের উন্নত চিকিৎসা ছিল না। তাই সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে কবিরাজের দ্বারস্থ হতেন। কবিরাজ গ্রামের মানুষকে বিশ্বাস করাতেন যে দাঁতে পোকা হয়।

কোনো কোনো রোগী অত সহজে মানতে চান না, তাই জিজ্ঞেস করেন—এত বড় পোকা দাঁতে বাস করছে, অথচ আগে দেখা যায়নি কেন? কবিরাজ বলেন, ‘দাঁত সাদা রঙের, এই পোকাগুলোও সাদা, তাই দেখা পাওয়া কঠিন।’

দাঁতের গর্তগুলো বড্ড কালো রঙের হয়, তার ভেতর সাদা পোকা থাকে কী করে? থাকলে সহজেই দেখা যাওয়ার কথা। এ রকম প্রশ্ন করলে কবিরাজ রোগীকে বানোয়াট কিছু একটা বুঝিয়ে দেন।

রোগী হয়তো ‘পোকা বের করা গিয়েছে’ বলে সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে আসেন। তবে সেটা সাময়িক। যেমনটা মানসুরা বেগমের ক্ষেত্রে দেখেছি আমরা। কয়েক দিন তাঁর দাঁত ভালো ছিল। কারণ, ওই লবঙ্গ ভেজানো পানি। এভাবে দাঁতের ক্ষতের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে সাময়িক দমিয়ে রাখা যায় বটে, কিন্তু চিরতরে ধ্বংস করা যায় না।

মা বেশি চিনি খেলে কি শিশুর দাঁতে পোকা হয়
আশপাশে মানকচুগাছ থাকলে এক কাজ করতে পারেন। হলুদ রঙের পচা ডাঁটাগুলো ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। দেখবেন, তার ভেতর অসংখ্য সাদা সাদা পোকা গিজগিজ করছে!

তাহলে ওই পোকাগুলো কী

যে পোকাগুলো যামিনি কবিরাজ বের করে দেখালেন, ওগুলো আসলে কী? যামিনি কবিরাজ মানকচুর ডাঁটা ব্যবহার করেছিলেন। হলুদ ডাঁটা। মানকচু গাছের বয়স যত বাড়ে, তত নতুন নতুন পাতা বের হয়। অন্যদিকে গোড়ার দিকের পাতা ও ডাঁটাগুলো পচে হলুদ হয়ে যায়। তখন ওর ভেতর মাছি বা ওই জাতীয় পতঙ্গরা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে একসময় লার্ভা বা শুঁয়োপোকা বের হয়। সাদা ধবধবে রঙের পোকা।

আশপাশে মানকচুগাছ থাকলে এক কাজ করতে পারেন। হলুদ রঙের পচা ডাঁটাগুলো ভালো করে খেয়াল করে দেখুন। দেখবেন, তার ভেতর অসংখ্য সাদা সাদা পোকা গিজগিজ করছে! সেগুলো দেখতে হুবহু দাঁত থেকে বের করা পোকাগুলোর মতোই। এবার দুয়ে দুয়ে চার মেলান। কবিরাজের হাতে কেন কচুর ডাঁটা ছিল, কেন তিনি তুকতাকের নামে সেই ডাঁটা আপনার দাঁতের ফাঁকে পরিষ্কার তুলায় ঘষলেন? প্রশ্নগুলো যুক্তি দিয়ে ভাবুন, জবাব পেয়ে যাবেন।

টুথপেস্ট আবিষ্কারের আগে মানুষ কী দিয়ে দাঁত মাজত
ল্যাকটিক অ্যাসিড দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দেয়। তৈরি হয় ক্যাভিটি বা গর্ত। গর্তের ভেতর আরও বেশি বেশি খাবার জমে, আরও বেশি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়, তত বেশি তৈরি হয় অ্যাসিড।

দাঁতের ক্ষয়ের আসল কারণ

তাহলে কি দাঁতে পোকা হয় না? না, আসলেই হয় না। দাঁতে যে বড় বড় গর্ত হয়, এর কারণ দাঁতের ক্ষয়। খাওয়ার পর দাঁতে খাবারের কিছু কণা লেগে থাকে। আমাদের মুখে সারা বছরই কিছু ব্যাকটেরিয়া বাস করে। স্ট্রেপটোকক্কাস মিউটান্স (Streptococcus mutans) ও ল্যাকটোব্যাসিলাস (Lactobacillus) নামে ব্যাকটেরিয়াগুলো দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী। দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার এই ব্যাকটেরিয়াদের খুব পছন্দ। ওরা খাবারের কণাগুলো ভেঙে পচিয়ে দেয়। ফলে তৈরি হয় ল্যাকটিক অ্যাসিড।

এই অ্যাসিড আবার দাঁতের চরম শত্রু। দাঁতের বাইরের পৃষ্ঠে এনামেল নামে একধরনের আবরণ থাকে, যা দাঁতকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ল্যাকটিক অ্যাসিড দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দেয়। তৈরি হয় ক্যাভিটি বা গর্ত। গর্তের ভেতর আরও বেশি বেশি খাবার জমে, আরও বেশি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়, তত বেশি তৈরি হয় অ্যাসিড। ফলে দাঁত আরও বেশি ক্ষয় হয়। একসময় ক্ষয় গভীর হয়ে দাঁতের স্নায়ুতন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছে যায় অ্যাসিড। তখন দাঁতের ভেতরের স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ হয়। ফলে হালকা একটু টোকা লাগলেও প্রচণ্ড ব্যথা লাগে। যন্ত্রণা হয়।

দাঁত ব্রাশ করার পরেও মুখে দুর্গন্ধ হয় কেন
আমাদের মুখে সারা বছরই কিছু ব্যাকটেরিয়া বাস করে। স্ট্রেপটোকক্কাস মিউটান্স ও ল্যাকটোব্যাসিলাস নামে ব্যাকটেরিয়াগুলো দাঁতের ক্ষয়ের জন্য দায়ী।

মজার ব্যাপার হলো, চিনিযুক্ত খাবার ব্যাকটেরিয়াদের বেশি পছন্দ। এরা চিনির মূল উপাদান সুক্রোজ ভেঙে দ্রুত ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে। তাই মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খেলে দাঁতের ক্ষয়রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে আসল কথা হলো, দাঁতে কোনো পোকা হয় না। দাঁতের ক্ষয় থেকে বাঁচতে হলে খাওয়ার পর নিয়মিত মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখতে হবে। দিনে অন্তত দুবার নিয়ম করে ব্রাশ করতে হবে। দাঁতের ক্ষত হলে কবিরাজের কাছে গিয়ে তুকতাক না করে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস

নচ্ছার আক্কেল দাঁত!